সংবাদ কলকাতা: নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের স্ত্রীরোগ বিভাগের এইচডিইউয়ে ডিউটিরত এক নার্সের রহস্যজনক মৃত্যু ঘিরে তদন্ত শুরু হয়েছে। মৃত নার্স রূপালী বর্মণ। বয়স ৩০ বছর। দমদমের বাসিন্দা রূপালীর দেহ হাসপাতালেরই এইচডিইউয়ের শৌচালয় থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে তাঁর শরীরে ফেন্টানিল প্রয়োগের সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে। তবে এখনও পর্যন্ত মৃত্যুর সঠিক কারণ নিশ্চিত নয়।
হাসপাতাল সূত্রে খবর, রাত ৮টা নাগাদ রূপালীর ডিউটি শুরু হয়। নার্সিং স্টেশনে কাজে যোগ দেওয়ার কিছু সময় পর তিনি ফেন্টানিলের তিনটি শিশি নিয়ে শৌচালয়ে যান বলে জানা গিয়েছে। এর পর দীর্ঘ সময় কেটে গেলেও তিনি নার্সিং স্টেশনে ফিরে আসেননি। বিষয়টি নজরে আসতেই সহকর্মীরা তাঁকে খুঁজতে শুরু করেন।
সহকর্মীরা শৌচালয়ের দরজার সামনে গিয়ে রূপালীর নাম ধরে ডাকেন। কিন্তু ভিতর থেকে কোনও উত্তর পাওয়া যায়নি। শেষ পর্যন্ত দরজা ভেঙে তাঁকে অচৈতন্য অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। হাসপাতালের চিকিৎসকেরা দ্রুত তাঁকে পরীক্ষা করেন। তাঁকে বেডে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসার চেষ্টা করা হলেও বাঁচানো যায়নি।
পুলিশের কাছে হাসপাতালের কর্মীরা জানিয়েছেন, রাত ১০টা ২০ মিনিট নাগাদ রূপালী শৌচালয়ে ঢুকেছিলেন। রাত ১০টা ২৭ মিনিট পর্যন্ত তিনি বাইরে না আসায় সহকর্মীদের সন্দেহ হয়। এরপরই দরজা খুলে তাঁকে উদ্ধার করা হয়। অর্থাৎ শৌচালয়ে যাওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই তাঁর সঙ্গে গুরুতর কিছু ঘটে থাকতে পারে বলে প্রাথমিক ভাবে মনে করা হচ্ছে।
ঘটনার খবর পেয়ে প্রথমে হাসপাতালের পুলিশ ফাঁড়িতে খবর দেওয়া হয়। পরে এন্টালি থানার পুলিশকে জানানো হয়। লালবাজারের খুনের মামলার তদন্তকারী শাখার আধিকারিকেরাও ঘটনাস্থলে পৌঁছন। হাসপাতালের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলার পাশাপাশি তাঁরা ঘটনার সময়কার পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করেন।
পুলিশের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে রূপালীর শরীরে কোনও আঘাতের চিহ্ন মেলেনি। শৌচালয় থেকেও কোনও সুইসাইড নোট পাওয়া যায়নি। তাই আপাতত তাঁর মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে না। একই সঙ্গে অন্য কোনও ব্যক্তির ভূমিকা ছিল কি না, সেই সম্ভাবনাও তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন।
চিকিৎসকদের প্রাথমিক অনুমান, রূপালীর কনুইয়ের সন্ধিস্থলের শিরায় ফেন্টানিল প্রয়োগ করা হয়ে থাকতে পারে। হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, রোগীদের ঘুম পাড়ানোর জন্য চিকিৎসাক্ষেত্রে এই ওষুধ ব্যবহার করা হয়। তবে রূপালীর শরীরে কী পরিমাণ ওষুধ গিয়েছিল এবং সেটিই তাঁর মৃত্যুর কারণ কি না, তা পরীক্ষার পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে।
ইতিমধ্যে রূপালীর দেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এই তদন্তে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তাঁর শরীরে কোনও ওষুধের উপস্থিতি ছিল কি না, মৃত্যুর আগে কী ঘটেছিল এবং মৃত্যুর নির্দিষ্ট কারণ কী, সেই বিষয়ে রিপোর্ট থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার আশা করছে পুলিশ।
রূপালীর মৃত্যুর ঘটনা ফের সরকারি হাসপাতালের নিরাপত্তা এবং নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ২০২৪ সালের আগস্টে আরজি কর হাসপাতালে এক মহিলা চিকিৎসক-পড়ুয়ার ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার পর রাজ্যের সরকারি হাসপাতালগুলিতে নিরাপত্তা বাড়ানোর বিষয়ে একাধিক উদ্যোগের কথা বলা হয়েছিল। সেই ঘটনার পরও হাসপাতালের ভিতরে অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা সামনে আসায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
চলতি বছরের মার্চে আরজি কর হাসপাতালে লিফট দুর্ঘটনায় এক যুবকের মৃত্যু হয়েছিল। একই সময়ে স্ট্রেচার না পেয়ে অসুস্থ এক প্রৌঢ় হেঁটে দোতলার শৌচালয়ে যাওয়ার সময় মারা যান বলেও জানা যায়। সরকারি হাসপাতালের পরিষেবা ও নিরাপত্তা নিয়ে সেই ঘটনাগুলির পর যে প্রশ্ন উঠেছিল, এনআরএসের নার্সের মৃত্যু ফের সেই আলোচনাকে সামনে নিয়ে এসেছে।
রূপালীর কাছে থাকা ফেন্টানিলের তিনটি শিশি, তাঁর শৌচালয়ে যাওয়ার সময়, দরজা খোলার আগের কয়েক মিনিট এবং তাঁর মৃত্যুর সঠিক কারণ—সবকিছুই এখন তদন্তের আওতায়। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এবং পুলিশের তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত মৃত্যুর কারণ নিয়ে কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে চাইছে না তদন্তকারীরা।
