সংবাদ কলকাতা: দুর্গাপুজোয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বড়সড় প্রস্তুতি নিচ্ছে কলকাতা পুলিশ। পুজোর দিনগুলিতে শহরজুড়ে প্রায় ৩২ হাজার পুলিশকর্মী মোতায়েন রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। ভিড় সামলানো, যানজট নিয়ন্ত্রণ, অপ্রীতিকর ঘটনা এড়ানো এবং দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই পুলিশের প্রধান লক্ষ্য। মঙ্গলবার সাংবাদিক বৈঠকে এই প্রস্তুতির কথা জানান কলকাতার পুলিশ কমিশনার অজয় নন্দা। একই সঙ্গে পুজোর সময় যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে বিশেষ নজরদারি ও একাধিক পদক্ষেপের কথাও জানিয়েছেন তিনি।
পুজোর আগে কলকাতা পুলিশের সমস্ত কর্মীর ছুটি বাতিল করা হয়েছে। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবেন কনস্টেবল থেকে শুরু করে বিভিন্ন পদমর্যাদার পুলিশ আধিকারিকরা। পাশাপাশি সিভিক ভলান্টিয়ার ও হোমগার্ডদেরও কাজে লাগানো হবে। শহরের গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা, পুজোমণ্ডপ সংলগ্ন এলাকা এবং দর্শনার্থীদের যাতায়াতের পথে বাড়তি নজরদারি চালানো হবে। ভিড়ের চাপে যাতে কোথাও বিশৃঙ্খলা তৈরি না হয়, সে দিকেও বিশেষ নজর রাখছে পুলিশ।
হারিয়ে যাওয়া শিশুদের খুঁজতে বিশেষ ব্যবস্থা
দুর্গাপুজোয় ভিড়ের মধ্যে শিশুদের হারিয়ে যাওয়ার ঘটনা এড়াতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে কলকাতা পুলিশ। মঙ্গলবার সকালে ভারতীয় তেল নিগমের সহযোগিতায় তৈরি পুজোর মানচিত্র প্রকাশ করেন পুলিশ কমিশনার অজয় নন্দা। প্রতি বছরই এই মানচিত্র তৈরি করা হয়। এ বছর এক লক্ষ শিশুর জন্য বিশেষ পরিচয় ব্যাজ তৈরি করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
পুলিশের পরিকল্পনা, পুজো দেখতে এসে কোনও শিশু পরিবারের সদস্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে ব্যাজের সাহায্যে দ্রুত তার পরিচয় শনাক্ত করে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া যাবে। ভিড়ের মধ্যে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে বলে মনে করছে পুলিশ।
১৪টি জায়গায় অ্যাম্বুল্যান্স, ২৪ ঘণ্টা চালু জরুরি পরিষেবা
পুজোর ভিড়ে কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতেও প্রস্তুতি নিয়েছে কলকাতা পুলিশ। শহরের ১৪টি নির্দিষ্ট জায়গায় অ্যাম্বুল্যান্স রাখা হবে। কোনও দর্শনার্থী অসুস্থ হয়ে পড়লে সংশ্লিষ্ট এলাকা থেকে দ্রুত অ্যাম্বুল্যান্স পাঠিয়ে তাঁকে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে। জরুরি প্রয়োজনে সাধারণ মানুষ যাতে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন, তার জন্য ১১২ এবং ১০০ নম্বরের পরিষেবা ২৪ ঘণ্টা চালু থাকবে।
পুলিশের লক্ষ্য, পুজোর সময় কোনও রকম অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া। ভিড় নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি জরুরি চিকিৎসা পরিষেবা যাতে নির্বিঘ্নে পৌঁছে দেওয়া যায়, তা নিশ্চিত করতেও বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
যানজট সামলাতে বিশেষ পরিকল্পনা, নজরে মা উড়ালপুল
দুর্গাপুজোয় কলকাতার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ যানজট নিয়ন্ত্রণ। প্রতিদিনই বিভিন্ন মণ্ডপে দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়ে। সেই সঙ্গে রাস্তার একাধিক জায়গায় ব্যারিকেড বসানো হয়। ফলে যান চলাচল এবং মানুষের যাতায়াতের স্বাভাবিক ছন্দ বজায় রাখা পুলিশের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
পুলিশ কমিশনার অজয় নন্দা জানান, পুজোর সময় দর্শনার্থীদের চলাচলের একটি নির্দিষ্ট প্রবাহ থাকে। সেই প্রবাহে কোনও বাধা তৈরি হলে যানজট ও বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা বাড়ে। এই সমস্যা মোকাবিলায় পুজোর মানচিত্র তৈরি করা হয়েছে। কোন রাস্তা দিয়ে দর্শনার্থীরা যাতায়াত করবেন এবং কোথায় কী ধরনের নিয়ন্ত্রণ থাকবে, তা পরিকল্পনা করেই পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করবে পুলিশ।
এ বছর বিশেষ নজরে রয়েছে মা উড়ালপুল। নিউ টাউন ও সল্টলেকের সঙ্গে কলকাতার যোগাযোগের ক্ষেত্রে এই উড়ালপুলের গুরুত্ব বেড়েছে। গত কয়েক মাসের যান চলাচলের তথ্য বিশ্লেষণ করে পুলিশ দেখেছে, এই পথে গাড়ির চাপ উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়েছে। ফলে উড়ালপুলের উপর কোনও গাড়ি খারাপ হয়ে গেলে বড় ধরনের যানজট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এই সমস্যা মোকাবিলায় মা উড়ালপুলের উপরেই গাড়ি খারাপ হলে দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার জন্য বিশেষ গাড়ি রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর ফলে বিকল গাড়ির কারণে যান চলাচল দীর্ঘক্ষণ আটকে থাকার সমস্যা কমানো সম্ভব হবে বলে মনে করছে পুলিশ।
সিগন্যাল না মেনে রাস্তা পার হলেই বাড়বে সমস্যা
পুজোর সময় রাস্তায় মানুষের ভিড় বাড়ার পাশাপাশি অনেকেই ট্রাফিক সিগন্যাল না মেনে রাস্তা পার হন। এর ফলে যান চলাচল ব্যাহত হয় এবং দুর্ঘটনার আশঙ্কাও তৈরি হয়। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পথচারীদের চলাচলের উপর নজরদারি বাড়ানো হবে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলিতে ট্রাফিক পুলিশ মোতায়েন রেখে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করা হবে।
সব মিলিয়ে, দুর্গাপুজোয় নিরাপত্তা, ভিড় নিয়ন্ত্রণ, শিশুদের সুরক্ষা, জরুরি চিকিৎসা এবং যানজট মোকাবিলাকে সামনে রেখে একাধিক ব্যবস্থা নিচ্ছে কলকাতা পুলিশ। উৎসবের দিনগুলিতে শহরের রাস্তায় যাতে সাধারণ মানুষ নিরাপদে যাতায়াত করতে পারেন এবং নির্বিঘ্নে পুজো দেখতে পারেন, সেটাই পুলিশের প্রধান লক্ষ্য।
