28 C
Kolkata
September 9, 2026
রাজ্য

যাদবপুরে ‘গেরুয়া সম্মান যাত্রা’, বিশ্ববিদ্যালয় সংশোধনী বিল ঘিরে বিতর্ক

সংবাদ কলকাতা: দক্ষিণ কলকাতার গোলপার্ক থেকে শুরু হয়ে যাদবপুরের এইট বি বাসস্ট্যান্ডে শেষ হল ‘গেরুয়া সম্মান যাত্রা’। বুধবারের এই কর্মসূচির শেষ পর্বে সভামঞ্চ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলির প্রশাসন ও পরিচালনা সংক্রান্ত সংশোধনী বিলকে ‘ঐতিহাসিক’ বলে দাবি করা হয়। বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর বিধানসভার বিশেষ অধিবেশনে ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল ইউনিভার্সিটিজ় অ্যান্ড কলেজেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অ্যান্ড রেগুলেশন অ্যামেন্ডমেন্ট বিল ২০২৬’ পেশ হওয়ার কথা।

সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে শুভেন্দু অধিকারী যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে তাঁর অবস্থান স্পষ্ট করেন। তিনি জানান, বিধানসভায় বিলটি নিয়ে আলোচনার সময় তাঁকেও বক্তব্য রাখার সুযোগ দেওয়ার জন্য উচ্চশিক্ষামন্ত্রী ও পরিষদীয় মন্ত্রীর কাছে আবেদন করেছেন। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে দেশবিরোধী স্লোগান এবং মাওবাদী নেতা কিষেণজিকে সমর্থনের অভিযোগ তুলে তিনি কড়া পদক্ষেপের ইঙ্গিত দেন।

তিনি বলেন, দেশের ভিতরে থেকে দেশকে অপমান করা হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন। এই ধরনের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে গীতা ও হনুমান চালিসা পাঠের কথাও সভা থেকে বলেন তিনি। পাশাপাশি যাদবপুরে তিন দিন বেদপাঠের কর্মসূচি করার কথাও জানান। সভায় উপস্থিত মানুষের উদ্দেশে তিনি জানতে চান, তাঁরা এই ধরনের কার্যকলাপের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে প্রস্তুত কি না।

এই বক্তব্য ঘিরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মহলেও প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। শিক্ষক সংগঠন আবুটার সাধারণ সম্পাদক গৌতম মাইতি জানান, গত ১৯ ও ২০ অগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে বহিরাগত হামলার পর থেকেই ক্যাম্পাস ও সংলগ্ন এলাকায় একের পর এক রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং বহিরাগত রাজনৈতিক ব্যক্তিদের উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাঁর দাবি, এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভয়, আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। স্বাভাবিক পঠনপাঠন ও গবেষণার কাজও তার প্রভাব থেকে মুক্ত থাকছে না।

সংগঠনের তরফে আরও বলা হয়েছে, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা, গবেষণা, মুক্তচিন্তা এবং গণতান্ত্রিক বৌদ্ধিক চর্চার গুরুত্বপূর্ণ পরিসর। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীন পরিবেশ বজায় রাখার পক্ষেও তারা মত প্রকাশ করেছে।

এরই মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের বদলি নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। গত সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছিলেন, রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের বদলির ব্যবস্থা করা হবে। দীর্ঘদিন কলকাতা বা বড় শহরের পুরনো বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষকদের নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে পড়ানোর সুযোগ তৈরি করার কথা বলা হয়। শিক্ষাকর্মীদের ক্ষেত্রেও একই নীতি কার্যকর করার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।

এই ঘোষণার পর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মহলের একাংশের মধ্যে সংশোধনী বিলের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষক মনে করছিলেন, বদলি সংক্রান্ত কোনও নতুন ব্যবস্থা চালু হলে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তার আওতায় আসতে পারেন।

তবে বিলের বিষয়বস্তু প্রকাশ্যে আসার আগেই তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। এআইডিএসও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির সম্পাদক বিশ্বজিৎ রায় বিলটির বিরোধিতা করেছেন। তাঁর অভিযোগ, এই সংশোধনী আইন বিশ্ববিদ্যালয়গুলির স্বাধিকার কমিয়ে দিয়ে দলতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলির পরিকাঠামোগত সমস্যা সমাধানে জোর না দিয়ে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর চেষ্টা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি। বিলের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলার ডাক দিয়েছে তাঁর সংগঠন।

অন্যদিকে, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এবিভিপি সভাপতি নিখিল দাস মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যকে স্বাগত জানিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে দুর্নীতির অভিযোগেরও তদন্ত হওয়া প্রয়োজন বলে দাবি করেছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, সংশোধনী বিলের আওতায় দুর্নীতির অভিযোগের যথাযথ তদন্ত হলে সংগঠনের পক্ষ থেকে সরকারকে তথ্যপ্রমাণ দিয়ে সহযোগিতা করা হবে।

বিলটি বিধানসভায় পেশ হওয়ার পর তার প্রকৃত বিধান ও ক্ষমতার পরিধি স্পষ্ট হবে। তার আগে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অবস্থান, শিক্ষক সংগঠনগুলির উদ্বেগ এবং বদলি নীতি—এই তিনটি বিষয় ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে।

Related posts

Leave a Comment