সংবাদ কলকাতা— উত্তর কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীনে দুর্গাপুজো দেখতে গিয়ে পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের মৃত্যুর ঘটনার পরদিনই সরিয়ে দেওয়া হল গিরিশ পার্ক থানার ওসি সুমিতকুমার ঘোষকে। তাঁর জায়গায় থানার অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের আধিকারিক হীরক দলপতিকে। রবিবার থেকেই নতুন দায়িত্ব সামলাতে শুরু করেছেন তিনি। চোরবাগানের মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর পুলিশি ভূমিকা ও ভিড় নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার মধ্যেই এই প্রশাসনিক রদবদল তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
কলকাতা পুলিশের সেন্ট্রাল ডিভিশনের অধীন গিরিশ পার্ক থানা। চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গাপুজোর মণ্ডপ এই থানার এলাকাতেই অবস্থিত। চলতি বছরের মার্চ মাস থেকে গিরিশ পার্ক থানার ওসি পদে ছিলেন সুমিতকুমার ঘোষ। ভোটের আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর একটি সভাকে কেন্দ্র করে ওই থানা এলাকায় অশান্তির ঘটনা ঘটেছিল। সেই সময় অন্য থানা থেকে বদলি হয়ে গিরিশ পার্কে এসেছিলেন সুমিত।
অন্য দিকে, হীরক দলপতি বর্তমানে কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগে কর্মরত। সম্প্রতি তারাতলায় একটি নির্মীয়মাণ গুদাম ভেঙে শ্রমিকদের মৃত্যুর ঘটনার তদন্তে গঠিত বিশেষ তদন্তকারী দলেও তিনি ছিলেন। এবার তাঁকেই গিরিশ পার্ক থানার অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হল।
শনিবার সপ্তমীর সন্ধ্যায় চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গাপুজোর মণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের মৃত্যু হয়। আহত হন আরও ২৫ জন। প্রত্যক্ষদর্শী ও দর্শনার্থীদের একাংশের অভিযোগ, ভিড় নিয়ন্ত্রণে যথাযথ ব্যবস্থা ছিল না। দুর্ঘটনার পর পুলিশ ও নিরাপত্তাকর্মীদের ঘটনাস্থলে পৌঁছতেও দেরি হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। এই অভিযোগ ঘিরে পুলিশ-প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।মুখ্যমন্ত্রী তথা রাজ্যের পুলিশমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী অবশ্য দাবি করেছেন, পুলিশ নিজের দায়িত্ব পালন করেছে। তবে অভিযোগ ও সম্ভাব্য গাফিলতির বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি। রবিবার সন্ধ্যায় তিনি পুলিশের কন্ট্রোল রুমে যান। দুর্ঘটনার পর পরিস্থিতি পর্যালোচনা এবং পুজোর বাকি দিনগুলিতে নিরাপত্তা জোরদার করার বিষয়টি প্রশাসনের কাছে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
চোরবাগানের ঘটনার পর কলকাতা পুলিশের ভিড় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় একাধিক পরিবর্তন আনা হচ্ছে। পুজোর দিনগুলিতে পরিস্থিতি সামাল দিতে অভিজ্ঞ বেশ কয়েক জন পুলিশকর্তাকে দায়িত্বে ফেরানো হয়েছে বলে খবর। অন্তত ন’জন আইপিএস আধিকারিককে সাময়িকভাবে কলকাতা পুলিশে ফিরিয়ে আনার খবরও সামনে এসেছে। তাঁদের পুজোর শহরে ভিড় নিয়ন্ত্রণের অভিজ্ঞতা রয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
পাশাপাশি, বড় পুজোগুলিতে দুর্ঘটনা এড়াতে কলকাতার সব থানাকে ১১ দফা নির্দেশিকা পাঠিয়েছে লালবাজার। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, বৃষ্টি শুরু হলে পরিস্থিতি বুঝে মণ্ডপের প্রবেশপথ বন্ধ করতে হবে। মণ্ডপের ভিতরে থাকা দর্শনার্থীদের নিরাপদে বাইরে বের করে আনার ব্যবস্থা করতে হবে এবং কোনওভাবেই ভিতরে অতিরিক্ত জমায়েত হতে দেওয়া যাবে না। মণ্ডপে পর্যাপ্ত আলো রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
নির্দেশিকায় আরও বলা হয়েছে, বৃষ্টি হলেও কর্তব্যরত পুলিশকর্মী বা আধিকারিকেরা নিজেদের দায়িত্বের জায়গা ছেড়ে যেতে পারবেন না। প্রয়োজনে তাঁদের রেনকোট রাখতে হবে। পরিস্থিতি অনুযায়ী দর্শনার্থীদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ভিআইপিদের গাড়িও মণ্ডপের একেবারে কাছে যেতে দেওয়া যাবে না। নির্দিষ্ট দূরত্বে গাড়ি রাখার ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে ভিড়ের মধ্যে চলাচলে বাধা তৈরি না হয়।
চোরবাগানের দুর্ঘটনার পর থানার ওসি বদল, অতিরিক্ত পুলিশকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া এবং নতুন নির্দেশিকা জারির মাধ্যমে পুজোর নিরাপত্তা আরও জোরদার করার চেষ্টা করছে প্রশাসন। তবে এই পদক্ষেপের পাশাপাশি দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনও গাফিলতি ছিল কি না, তা তদন্তে স্পষ্ট হওয়াই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
previous post
