28 C
Kolkata
August 15, 2026
রাজ্য

টিটিপি-যোগের অভিযোগে বেঙ্গালুরুতে গ্রেপ্তার বাদুড়িয়ার যুবক

‘ছেলে এমন কাজ করতে পারে না’, দাবি মায়ের

বেঙ্গালুরু: তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তানের সঙ্গে যোগাযোগ এবং অনলাইনে জঙ্গি কার্যকলাপে যুক্ত হওয়ার অভিযোগে কর্নাটকের বেঙ্গালুরুতে গ্রেপ্তার হয়েছেন উত্তর ২৪ পরগনার বাদুড়িয়া থানার যদুরহাটি পঞ্চায়েতের নোয়াপাড়ার বাসিন্দা ২৩ বছরের আসাফুল মালিক। কর্নাটক পুলিশের অভিযোগ, অনলাইনের মাধ্যমে জঙ্গি কার্যকলাপে যোগ দেওয়ার জন্য প্রভাবিত হয়েছিলেন ওই যুবক। পরে পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন টিটিপির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিলেন তিনি। তবে আসাফুলের পরিবার এই অভিযোগ বিশ্বাস করতে পারছে না। পরিবারের দাবি, পড়াশোনায় ভাল ছিলেন ওই যুবক এবং সরকারি চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।

স্বাধীনতা দিবসের আবহের মধ্যেই ছেলের গ্রেপ্তারের খবর আসে পরিবারের কাছে। দূর কর্নাটকে ছেলেকে গ্রেপ্তারের খবর পাওয়ার পর দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে বাদুড়িয়ার ওই পরিবারের। ছেলের সঙ্গে দেখা করতে বেঙ্গালুরু গিয়েছেন আসাফুলের বাবা। অন্য দিকে, বাড়িতে ছেলের নির্দোষিতার দাবিতে অনড় তাঁর মা হাসিনা বিবি।

পড়াশোনায় ভাল ছিলেন আসাফুল
পরিবারের সদস্যদের দাবি, নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান আসাফুল ছোট থেকেই পড়াশোনায় মনোযোগী ছিলেন। গোবরডাঙা হিন্দু কলেজ থেকে স্নাতক হওয়ার পর সরকারি চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি শুরু করেন তিনি। পুলিশের চাকরির জন্যও পরীক্ষা দিয়েছিলেন বলে পরিবার জানিয়েছে।

হাসিনা বিবির কথায়, ‘আমার ছেলে সব সময় পড়াশোনা নিয়ে থাকত। গোবরডাঙা হিন্দু কলেজ থেকে স্নাতক হয়েছে। তার পর বিভিন্ন সরকারি চাকরির পরীক্ষা দিয়েছে। পুলিশের চাকরির জন্যও চেষ্টা করেছিল।’

ছেলের পড়াশোনার প্রমাণ হিসেবে বাড়িতে রাখা বইপত্র দেখান তিনি। সরকারি চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য ব্যবহৃত বইয়ের মধ্যে ছিল পশ্চিমবঙ্গ সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার প্রস্তুতির বইও। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে চাকরির চেষ্টা করেও সাফল্য না আসায় সংসারের প্রয়োজনেই বেঙ্গালুরুতে চলে যেতে হয় আসাফুলকে বলে পরিবারের দাবি।

দেড় বছর ধরে বেঙ্গালুরুতে
পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রায় দেড় বছর আগে কাজের সন্ধানে বেঙ্গালুরু যান আসাফুল। সেখানে একটি বেসরকারি সংস্থায় নিরাপত্তারক্ষীর কাজ করছিলেন তিনি। বেঙ্গালুরু যাওয়ার পর গত দেড় বছরে এক বারও বাড়ি ফেরেননি বলে পরিবার জানিয়েছে।

পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল কি না, তা নিয়ে বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি। তবে তাঁর গ্রেপ্তারের খবর পরিবার নিজেরা জানতে পারেনি। বেঙ্গালুরু পুলিশের তরফে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয় এবং পরে আসাফুলের বাবাকে সেখানে যাওয়ার কথা জানানো হয়।

ছেলের গ্রেপ্তারের খবর পাওয়ার পরই কর্নাটকের উদ্দেশে রওনা দেন তাঁর বাবা। সেখানে তদন্তকারীরা বাবা ও ছেলেকে মুখোমুখি বসিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন বলে স্থানীয় পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে।

কী অভিযোগ পুলিশের?
কর্নাটক পুলিশের দাবি, বেঙ্গালুরুর বোম্মাসান্দ্রা শিল্পাঞ্চলে টহল দেওয়ার সময় পশ্চিমবঙ্গের এক যুবকের সন্দেহজনক কার্যকলাপের বিষয়ে তথ্য পায় পুলিশ। সেই তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু হয়। পরে এপিসি সার্কল এলাকায় আসাফুলের সন্ধান পাওয়া যায় বলে পুলিশের দাবি।

তদন্তকারীরা তাঁর পাসপোর্ট এবং ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট পরীক্ষা করেছেন। পুলিশের দাবি, বিদেশ থেকে তাঁর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে অর্থ আসার তথ্যও পাওয়া গিয়েছে। এই আর্থিক লেনদেনের উৎস এবং উদ্দেশ্য নিয়ে তদন্ত চলছে বলে জানা গিয়েছে।

পুলিশের আরও দাবি, জিজ্ঞাসাবাদের সময় আসাফুল অনলাইনের মাধ্যমে জঙ্গি কার্যকলাপে যোগ দেওয়ার জন্য প্রভাবিত হওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। পরে টিটিপির সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগও সামনে আসে। তিনি আফগানিস্তানে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন কি না, সেই বিষয়টিও তদন্তের আওতায় রয়েছে বলে জানা গিয়েছে।

তবে পুলিশের এই সমস্ত অভিযোগের বিষয়ে আদালতে কী তথ্য ও প্রমাণ পেশ করা হয়েছে, তা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনও সামনে আসেনি। ফলে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে অভিযোগগুলির পূর্ণ সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সম্ভব নয়।

‘ছেলে এমন কাজ করতে পারে না’, বলছেন মা
ছেলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ মানতে নারাজ আসাফুলের মা। বাড়ির উঠোনে বসে কান্নায় ভেঙে পড়ে তিনি বার বার ছেলের পড়াশোনা এবং চাকরির চেষ্টার কথা বলছেন।

হাসিনা বিবির বক্তব্য, ‘ও এমন কিছু করতে পারে, আমি বিশ্বাসই করি না। আমার ছেলে ভাল। কত কষ্ট করেছে।’

পরিবারের বক্তব্য, আর্থিক সমস্যার মধ্যেও আসাফুল পড়াশোনা চালিয়ে গিয়েছেন। সরকারি চাকরি পাওয়ার জন্য বিভিন্ন পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত সংসারের চাপ সামলাতে বেঙ্গালুরুতে নিরাপত্তারক্ষীর কাজ নিতে হয় তাঁকে। এই পরিস্থিতিতে তাঁর বিরুদ্ধে জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগে পরিবার স্বাভাবিক ভাবেই বিস্মিত।

এলাকাতেও তৈরি হয়েছে প্রশ্ন
আসাফুলের গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর নোয়াপাড়া এলাকায় তাঁকে নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। স্থানীয়দের একাংশের দাবি, তাঁকে তাঁরা শান্ত স্বভাবের এবং পড়াশোনায় মনোযোগী যুবক হিসেবেই জানতেন।

প্রতিবেশী শুকুর আলি মণ্ডলের কথায়, ‘আসাফুলকে খুব ভাল ছেলে বলে জানতাম। চাকরির পরীক্ষা দিচ্ছিল। কেন ওকে পুলিশ ধরেছে, তার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ, আমরা কিছুই জানতে পারিনি।’

স্থানীয়দের একাংশের মনে প্রশ্ন উঠেছে, আসাফুল সত্যিই কোনও জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কি না। আবার অন্য একটি অংশ মনে করছে, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক হবে না। ফলে গ্রামে এখন মূল আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে বেঙ্গালুরু পুলিশের এই গ্রেপ্তারি।

আগের একটি মামলার সঙ্গে তুলনা স্থানীয়দের
আসাফুলের গ্রেপ্তারের পর স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ কয়েক বছর আগে উত্তর ২৪ পরগনারই এক যুবতীর বিরুদ্ধে ওঠা জঙ্গি-যোগের অভিযোগের প্রসঙ্গও টেনে আনছেন। তানিয়া খাতুন নামে ওই যুবতীর বিরুদ্ধে জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগ উঠেছিল এবং তাঁর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে বিদেশ থেকে অর্থ আসার অভিযোগও সামনে এসেছিল। তিনি এখনও জেলে রয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে।

তবে দু’টি ঘটনার মধ্যে সরাসরি কোনও যোগ রয়েছে কি না, তার কোনও প্রমাণ এখনও সামনে আসেনি। তাই শুধুমাত্র স্থানীয় আলোচনার ভিত্তিতে দুই ঘটনাকে একই সূত্রে দেখা ঠিক হবে না।

তদন্তেই এখন নজর পরিবারের
আসাফুলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ কতটা সত্য, তাঁর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে বিদেশ থেকে টাকা কেন এসেছিল, অনলাইনে কার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল এবং টিটিপির সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের প্রকৃতি কী ছিল— এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে তদন্তকারীরা।

অন্য দিকে, ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন পরিবার চাইছে দ্রুত সত্য সামনে আসুক। পরিবারের দাবি, আসাফুল যদি কোনও অপরাধে জড়িত না থাকেন, তা হলে তদন্তের মাধ্যমে তাঁর নির্দোষিতাও স্পষ্ট হবে।

একদিকে পুলিশের তরফে জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগের মতো গুরুতর অভিযোগ, অন্য দিকে পরিবারের তরফে ছেলেকে নির্দোষ বলে দাবি— দুইয়ের মধ্যে সত্য কোথায়, তা এখন তদন্তের ফল এবং আদালতের প্রক্রিয়ার উপরই নির্ভর করছে। বাদুড়িয়ার এই যুবকের গ্রেপ্তারির পর তাই তদন্তের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই নজর রয়েছে পরিবার এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের।

Related posts

Leave a Comment