November 2, 2026
রাজ্য

কলকাতায় বাসের ন্যূনতম ভাড়া ১৮ টাকা করার দাবি মালিকদের

সংবাদ কলকাতা: রাজ্যে বেসরকারি বাস ও মিনিবাসের ভাড়া বাড়ানোর দাবিতে ফের সরব হলেন মালিকেরা। তাঁদের বক্তব্য, ২০১৮ সালের পর থেকে সরকারি ভাবে বাসভাড়া বাড়েনি। অথচ এই কয়েক বছরে জ্বালানি, যন্ত্রাংশ, কর্মীদের বেতন এবং বাস রক্ষণাবেক্ষণের খরচ অনেকটাই বেড়েছে। ফলে আর্থিক চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন বাসমালিকেরা। এই পরিস্থিতিতে কলকাতায় সাধারণ বাসের ন্যূনতম ভাড়া ১৮ টাকা করার প্রস্তাব দিয়ে পরিবহণমন্ত্রী অর্জুন সিংহকে চিঠি দিল ‘জয়েন্ট কাউন্সিল অফ বাস সিন্ডিকেটস’।

সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক তপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, গত আট বছরে বেসরকারি বাস পরিষেবা পরিচালনার খরচ উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়েছে। করোনা অতিমারির ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই জ্বালানি তেলের দাম এবং বাসের রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় বৃদ্ধি মালিকদের সমস্যায় ফেলেছে। একাধিক বার পরিবহণমন্ত্রী বদল হলেও ভাড়া বৃদ্ধির দাবি এখনও পূরণ হয়নি বলে অভিযোগ সংগঠনের।

চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, গত ১৪ সেপ্টেম্বর ন’দফা দাবি জানিয়ে পরিবহণ দপ্তরে একটি স্মারকলিপি জমা দিয়েছিল বাসমালিকদের সংগঠন। সেই সময় দুর্গাপুজোর পর ভাড়া সংক্রান্ত বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি তাদের। সেই আশ্বাসের কথা মনে করিয়ে দিয়েই এ বার নতুন করে ভাড়ার কাঠামো প্রস্তাব করেছে সংগঠন।

প্রস্তাবিত ভাড়ার তালিকা অনুযায়ী, কলকাতায় সাধারণ বাসে প্রথম চার কিলোমিটার পর্যন্ত ন্যূনতম ভাড়া ১৮ টাকা করার দাবি জানানো হয়েছে। চার থেকে ছয় কিলোমিটারের জন্য ২০ টাকা, ছয় থেকে আট কিলোমিটারে ২২ টাকা, আট থেকে ১২ কিলোমিটারে ২৪ টাকা, ১২ থেকে ১৬ কিলোমিটারে ২৬ টাকা এবং ১৬ থেকে ২০ কিলোমিটারে ২৮ টাকা ভাড়া নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে। ২০ থেকে ২২ কিলোমিটার পর্যন্ত ভাড়া ৩০ টাকা করার কথা বলা হয়েছে।

শুধু কলকাতা নয়, জেলার বাসগুলির ভাড়াও বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে সংগঠন। প্রস্তাব অনুযায়ী, জেলার সাধারণ বাসে প্রথম চার কিলোমিটারের ভাড়া ২০ টাকা এবং তার পর প্রতি কিলোমিটারে ১ টাকা ২০ পয়সা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এক্সপ্রেস বাসে প্রথম চার কিলোমিটারের ভাড়া ২৫ টাকা এবং পরবর্তী প্রতি কিলোমিটারে ১ টাকা ৫০ পয়সা করার প্রস্তাব রয়েছে। সাধারণ এসি বাসে প্রথম চার কিলোমিটারের ভাড়া ৪০ টাকা এবং ভলভো বাসে প্রথম দুই কিলোমিটারের ভাড়া ৫০ টাকা করার দাবি জানানো হয়েছে।

এ ছাড়া হাওড়া, দুর্গাপুর, আসানসোল, মালদহ এবং দার্জিলিঙের মতো শহর ও পাহাড়ি এলাকার মিনিবাসের ভাড়াও দ্রুত পুনর্নির্ধারণের দাবি উঠেছে।

বাসমালিকদের যুক্তি, বছরে গড়ে মাত্র ২৭০ দিন বাস রাস্তায় চালানো সম্ভব হয়। কিন্তু বাস চলুক বা না চলুক, মালিকদের একাধিক নির্দিষ্ট খরচ বহন করতে হয়। জ্বালানি, কর্মীদের বেতন, টায়ার, মেরামতি এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক খরচের পাশাপাশি রয়েছে ব্যাঙ্কের ঋণের কিস্তি, তিন মাস অন্তর রোড ট্যাক্স, বার্ষিক ফিটনেস সার্টিফিকেট ও বিমার খরচ। এই পরিস্থিতিতে বর্তমান ভাড়ায় পরিষেবা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে বলে দাবি সংগঠনের। তাদের বক্তব্য, বাস পরিষেবা টিকিয়ে রাখতে এবং মালিক ও পরিচালকদের ন্যূনতম আয় নিশ্চিত করতে বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভাড়া নির্ধারণ জরুরি।

অন্য দিকে, পরিবহণ দপ্তরের একাংশের বক্তব্য, সরকারি ভাবে ভাড়া না বাড়লেও বেসরকারি বাসমালিকদের একাংশ ইতিমধ্যেই নিজেদের মতো করে ভাড়া নিচ্ছেন। তাঁদের দাবি, বর্তমানে অনেক বাসে ন্যূনতম ভাড়া ১৫ টাকা নেওয়া হচ্ছে। দূরত্ব অনুযায়ী সেই ভাড়া বেড়ে ১৮ টাকা পর্যন্ত পৌঁছচ্ছে। বিষয়টি সরকারের নজরে রয়েছে বলেও ওই অংশের দাবি। তবে ভাড়া বৃদ্ধির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সামগ্রিক পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা হবে।


উল্লেখ্য, সরকারি ভাবে কলকাতায় সাধারণ বাসের ন্যূনতম ভাড়া এখনও সাত টাকা। এর আগে বাসভাড়া বৃদ্ধি নিয়ে একাধিক বার দাবি উঠেছে। বিষয়টি আদালত পর্যন্তও গড়িয়েছিল। সেই সময় রাজ্য সরকার আদালতে হলফনামা দিয়ে জানিয়েছিল, সরকারি ভাবে বাসের ন্যূনতম ভাড়া সাত টাকা। এর বেশি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে বলে সরকারের জানা নেই বলেও জানানো হয়েছিল।

তবে করোনা অতিমারির পর বাসমালিকদের একাংশ নিজেদের উদ্যোগে ন্যূনতম ভাড়া ১০ টাকা করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তী সময়ে সেই ভাড়া আরও বেড়ে ১৫ টাকা হয়েছে বলে পরিবহণ দপ্তরের একাংশের দাবি। সরকারি অনুমোদন ছাড়া ভাড়া বৃদ্ধির এই পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

পুজোর আগে পরিবহণমন্ত্রী অর্জুন সিংহ জানিয়েছিলেন, দুর্গাপুজোর পর বাসভাড়া বৃদ্ধির বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হবে। সেই ঘোষণার পরেই নতুন ভাড়ার প্রস্তাব জমা দিল বাসমালিকদের সংগঠন। তবে তাদের এই দাবিতে রাজ্য সরকার কী সিদ্ধান্ত নেয়, তা এখনও স্পষ্ট নয়। ভাড়া বাড়লে যাত্রীদের উপর কতটা আর্থিক চাপ পড়বে, পাশাপাশি বাস পরিষেবার মান উন্নত করার ক্ষেত্রে মালিকেরা কী পদক্ষেপ করবেন, সেই প্রশ্নও সামনে আসছে।

Related posts

Leave a Comment