29 C
Kolkata
October 4, 2026
খেলা

৮৫ পদক নিয়ে এশিয়ান গেমসে চতুর্থ ভারত, একের পর এক ইতিহাস গড়লেন ভারতীয় ক্রীড়াবিদরা

সংবাদ কলকাতা:— আয়চি-নাগোয়ায় ২০২৬ এশিয়ান গেমস অভিযান শেষ করল ভারত। মোট ৮৫টি পদক নিয়ে পদক তালিকায় চতুর্থ স্থানে থেকে প্রতিযোগিতা শেষ করেছে ভারতীয় দল। এর মধ্যে রয়েছে ২১টি সোনা, ২৭টি রুপো এবং ৩৭টি ব্রোঞ্জ। যদিও হাংঝৌ এশিয়ান গেমসে ২০২৩ সালে জেতা ১০৬টি পদকের রেকর্ড এবার ছোঁয়া সম্ভব হয়নি, তবু একাধিক ঐতিহাসিক সাফল্য, শিরোপা ধরে রাখা এবং জাতীয় রেকর্ড গড়ার কারণে আয়চি-নাগোয়া অভিযান ভারতীয় ক্রীড়ার ইতিহাসে বিশেষ জায়গা করে নিল।

প্রায় ৫০০ জন ভারতীয় ক্রীড়াবিদ জাপানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী ক্রীড়া শক্তি হিসেবে নিজেদের জায়গা ধরে রাখে ভারত। পদক জয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অবদান অ্যাথলেটিক্সের। এই বিভাগ থেকে এসেছে মোট ২৪টি পদক। শুটিং থেকে এসেছে ১৫টি পদক। সোনার নিরিখে সবচেয়ে সফল ছিল তিরন্দাজি। এই বিভাগে ভারত পেয়েছে পাঁচটি সোনা। বক্সিং থেকেও এসেছে তিনটি সোনা।

প্রতিযোগিতার শেষ পর্বে ভারতের সাফল্যের ঝড় আরও জোরালো হয়। পুরুষদের হকি, পুরুষদের ক্রিকেট, কুস্তি, গল্ফ এবং তিরন্দাজিতে সোনা জিতে দুর্দান্তভাবে অভিযান শেষ করে ভারত।

পুরুষদের হকিতে মালয়েশিয়াকে ৫-১ গোলে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বার এশিয়ান গেমসের সোনা ধরে রাখে ভারত। একইসঙ্গে ২০২৮ লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিক্সের সরাসরি যোগ্যতাও অর্জন করে দল। ফাইনালে অধিনায়ক হরমনপ্রীত সিং দুটি গোল করেন। এছাড়া জুগরাজ সিং, হার্দিক সিং এবং শিলানন্দ লাকরা একটি করে গোল করেন। পুরো প্রতিযোগিতায় ১২টি গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতাও হন হরমনপ্রীত।

এই নিয়ে এশিয়ান গেমসে পুরুষদের হকিতে ভারতের সোনার সংখ্যা দাঁড়াল পাঁচ। এর আগে ১৯৬৬, ১৯৯৮, ২০১৪ এবং ২০২২ সালে সোনা জিতেছিল ভারত। পাকিস্তানের পর ভারতই দ্বিতীয় দেশ, যারা এশিয়ান গেমসে পুরুষদের হকিতে পরপর দুইবার সোনা ধরে রাখল। হরমনপ্রীতও তৈরি করেছেন নতুন নজির। তিনিই প্রথম ভারতীয় পুরুষ হকি অধিনায়ক, যিনি দলকে নেতৃত্ব দিয়ে দু’বার এশিয়ান গেমসের সোনা জেতালেন।

মহিলাদের হকিতেও দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হয়েছে। ফাইনালে চিনকে ১-০ গোলে হারিয়ে ৪৪ বছর পর এশিয়ান গেমসে সোনা জেতে ভারতীয় মহিলা দল। প্রথমবার একই এশিয়ান গেমসে ভারতের পুরুষ ও মহিলা—দুই হকি দলই সোনা জিতল।

ক্রিকেটেও সাফল্যের ধারা বজায় রেখেছে ভারত। পুরুষদের টি-২০ ক্রিকেটে পাকিস্তানকে ১৯ রানে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বার সোনা জেতে ভারত। প্রথমে ব্যাট করে ৬ উইকেটে ২১১ রান করে ভারত। অভিষেক শর্মা ২৮ বলে ৬১ এবং তিলক বর্মা অপরাজিত ২২ বলে ৫১ রান করেন। জবাবে পাকিস্তান ৬ উইকেটে ১৯২ রানেই থেমে যায়। পাকিস্তানের হাসান নওয়াজ ৫১ বলে ৯৬ রান করে ম্যাচে উত্তেজনা তৈরি করলেও শেষ পর্যন্ত জয় তুলে নেয় ভারত।

মহিলাদের ক্রিকেট দলও শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে নিজেদের শিরোপা ধরে রাখে। কাবাডিতেও একই সাফল্য। পুরুষ ও মহিলা—দুই দলই সোনা জিতে নেয়।

গল্ফে ইতিহাস প্রণবীর

গল্ফে নতুন ইতিহাস তৈরি করেন প্রণবী উর্স। তিনিই প্রথম ভারতীয় মহিলা, যিনি এশিয়ান গেমসে ব্যক্তিগত গল্ফে সোনা জিতলেন। ১৫-আন্ডার ২৬৫ স্কোর করে চিনের ইয়িন রুয়োনিংকে এক শটে পিছনে ফেলেন তিনি। তাঁর সাফল্যের পাশাপাশি অদিতি অশোক ও দীক্ষা ডাগরের সঙ্গে দলগত বিভাগে রুপোও জেতে ভারত।

তিরন্দাজিতেও ঐতিহাসিক সাফল্য আসে। ১৭ বছরের কুমকুম অনিল মোহদ প্রথম ভারতীয় মহিলা হিসেবে এশিয়ান গেমসে ব্যক্তিগত রিকার্ভ বিভাগে সোনা জেতেন। দক্ষিণ কোরিয়ার ও ইয়ে-জিনের বিরুদ্ধে শুট-অফে শেষ তিরে ১০ পয়েন্টের ঘরে আঘাত করে সোনা নিশ্চিত করেন তিনি।


কুমকুম, অঙ্কিতা ভকত এবং কীর্তি শর্মার ভারতীয় মহিলা রিকার্ভ দলও সোনা জেতে। এশিয়ান গেমসে মহিলাদের দলগত রিকার্ভ বিভাগে এটাই ভারতের প্রথম সোনা। কুমকুমের ব্যক্তিগত সাফল্যের সঙ্গে ২০২৮ লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিক্সের জন্য ভারতের একটি কোটা স্থানও নিশ্চিত হয়েছে। তবে অলিম্পিক্সে কে প্রতিনিধিত্ব করবেন, তা পরবর্তী বাছাই পরীক্ষার মাধ্যমে ঠিক হবে।

শুটিং এবং কুস্তিতেও সোনা

মহিলাদের ট্র্যাপ ইভেন্টে সোনা জিতে ভারতের প্রথম ব্যক্তিগত সোনার পদক এনে দেন নীরু ধান্ডা। কমলজিৎ এবং সুচি সিংও মিক্সড টিম ১০ মিটার এয়ার পিস্তলে এশিয়ান রেকর্ডের সমান পারফরম্যান্স করে সোনা জেতেন।

কুস্তিতে হাংঝৌয়ে ব্রোঞ্জ জেতা আমন সেহরাওয়াত এবার সোনায় রং বদলান। পুরুষদের ৫৭ কেজি বিভাগে উত্তর কোরিয়ার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন চং সং হানকে ১০-৭ ব্যবধানে হারিয়ে সোনা জেতেন তিনি। সুজিত কালকালও সোনা জেতেন। মেয়েদের ৫৩ কেজিতে অন্তিম পঙ্ঘাল রুপো এবং পুরুষদের ৯৭ কেজিতে দীপক পুনিয়া ব্রোঞ্জ পান। কুস্তিতে ভারতের মোট পদক ছয়টি—দুটি সোনা, দুটি রুপো এবং দুটি ব্রোঞ্জ।

বক্সিংয়েও ভারতের ঝুলি ভরেছে। লভলিনা বরগোহাঁই ৭৫ কেজি বিভাগে সোনা জিতে বিশেষ নজির গড়েন। মেরি কমের পর তিনিই দ্বিতীয় ভারতীয় মহিলা বক্সার, যিনি এশিয়ান গেমসে সোনা জিতলেন।

অ্যাথলেটিক্সে ২৪ পদক

ভারতের সবচেয়ে সফল বিভাগ ছিল অ্যাথলেটিক্স। মোট ২৪টি পদক এসেছে এই বিভাগ থেকে। ভিথ্যা রামরাজ মহিলাদের ৪০০ মিটার হার্ডলসে ব্রোঞ্জ জেতার পাশাপাশি ৪২ বছর পুরনো জাতীয় রেকর্ড ভেঙেছেন।

পুরুষদের জ্যাভলিনে যশ বীর সিং রুপো এবং রোহিত যাদব ব্রোঞ্জ জেতেন। চোটের কারণে এই প্রতিযোগিতায় ছিলেন না নীরজ চোপড়া।

সাওয়ান বারওয়াল ১৯৮২ সালের পর এশিয়ান গেমসে ম্যারাথনে ভারতের প্রথম পদক জেতেন এবং একইসঙ্গে জাতীয় রেকর্ড গড়েন। পুরুষদের হাই জাম্পে ৫৬ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটান সর্বেশ কুশারে। বারানিকা এলানগোভান প্রথম ভারতীয় পোল ভল্টার হিসেবে এশিয়ান গেমসে পদক জেতেন। মহিলাদের ১০ হাজার মিটারে সীমা কুমারীও ১৬ বছরের অপেক্ষা শেষ করে পদক এনে দেন।

একাধিক খেলায় প্রথম পদক

ভারতের সাফল্য শুধু পরিচিত পদকজয়ী খেলাগুলির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। মিক্সড মার্শাল আর্টসে ব্রোঞ্জ জিতে দেশের হয়ে প্রথম এশিয়ান গেমস পদক এনে দেন সুচিকা তারিয়াল। সফট টেনিসে জয় মীনা সেমিফাইনালে উঠে ব্রোঞ্জ জেতেন। এই খেলাতেও এশিয়ান গেমসে ভারতের সেটিই প্রথম পদক।

ভারোত্তোলনে মহিলাদের ৪৯ কেজি বিভাগে রুপো জিতে প্রথমবার এশিয়ান গেমস পদক পান মীরাবাই চানু। ১৯৯৮ সালের ব্যাংকক এশিয়ান গেমসের পর ভারোত্তোলনে এটিই ভারতের প্রথম পদক।

উশুতে রোশিবিনা দেবী টানা তৃতীয় এশিয়ান গেমসে পদক জেতেন। স্কোয়াশে অনাহত সিং মহিলাদের সিঙ্গলসে রুপো জিতে প্রথম ভারতীয় মহিলা হিসেবে এই নজির গড়েন। অনাহত এবং অভয় সিং—দু’জনেই নিজেদের সিঙ্গলস ফাইনালে উঠে সোনার খুব কাছাকাছি পৌঁছেছিলেন।

২০২৮ অলিম্পিক্সের দিকেও নজর

আয়চি-নাগোয়া এশিয়ান গেমস ভারতের কাছে শুধু পদক জয়ের মঞ্চ ছিল না, ২০২৮ লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিক্সের প্রস্তুতির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তিরন্দাজি, হকি, সেলিং, স্কোয়াশ, সার্ফিং, টেনিস এবং ট্রায়াথলনের মতো সাতটি খেলায় অলিম্পিক্সের যোগ্যতা অর্জনের সুযোগ ছিল।

ভারত পুরুষ ও মহিলা হকিতে অলিম্পিক্সের কোটা নিশ্চিত করেছে। তিরন্দাজিতেও কম্পাউন্ড মিক্সড টিম এবং মহিলা ব্যক্তিগত রিকার্ভ বিভাগে কোটা পেয়েছে দেশ।


শুক্রবার ভারতের সবচেয়ে সফল দিন ছিল। ওই দিন মোট ১২টি পদক জেতে ভারত, যার মধ্যে ছিল ছয়টি সোনা। বক্সিং থেকেই এসেছিল তিনটি সোনা। পরের দিন আরও নয়টি পদক আসে। পুরুষদের ক্রিকেট ও হকি, আমন সেহরাওয়াত, কুমকুম মোহদ এবং প্রণবী উর্স সোনা জেতেন।

শেষ পর্যন্ত ২১টি সোনা, ২৭টি রুপো এবং ৩৭টি ব্রোঞ্জ-সহ মোট ৮৫টি পদক নিয়ে চতুর্থ স্থানে শেষ করে ভারত। হাংঝৌয়ের ১০৬ পদকের রেকর্ড এবার অক্ষত থাকলেও আয়চি-নাগোয়ার অভিযানকে ব্যর্থ বলা যাবে না। শিরোপা ধরে রাখা, নতুন ইভেন্টে প্রথম পদক, জাতীয় রেকর্ড এবং একাধিক ঐতিহাসিক সাফল্য—সব মিলিয়ে ২০২৮ অলিম্পিক্সের আগে ভারতীয় ক্রীড়ার জন্য নতুন আশার জায়গা তৈরি করে দিল এই এশিয়ান গেমস।

Related posts

Leave a Comment