দিল্লি: ধর্ষণ মামলায় দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিকে ‘কাকা’ বলে ডাকত নাবালিকা। আদালতের কাছে তার একটাই আর্জি ছিল—যে ব্যক্তি তার উপর নির্যাতন চালিয়েছে, তাকে যেন বৃদ্ধ হওয়া পর্যন্ত জেলেই রাখা হয়। নাবালিকার সেই আবেদন শুনেছিলেন রোহিণী আদালতের বিচারক রজনী রাঙ্গা। শুধু রায়েই নয়, নাবালিকার উদ্দেশে আলাদা একটি চিঠি লিখেও তাঁর সেই আবেদনের জবাব দিয়েছেন বিচারক। দিল্লি হাই কোর্টও সেই চিঠি নাবালিকা বা তার পরিবারের হাতে পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
রোহিণী আদালতের অতিরিক্ত দায়রা বিচারক রজনী রাঙ্গা নাবালিকার উপর গুরুতর যৌন নির্যাতনের মামলায় অভিযুক্তকে তাঁর স্বাভাবিক জীবনকাল পর্যন্ত কারাদণ্ডের নির্দেশ দিয়েছিলেন। একই সঙ্গে ভয় দেখানোর অপরাধে পাঁচ বছরের কারাদণ্ডও দেওয়া হয়েছিল। দুই সাজা একই সঙ্গে চলবে। অভিযুক্তের উপর আর্থিক জরিমানাও করা হয়।
রায়ের শেষে প্রথাগত আইনি ভাষা এড়িয়ে সরাসরি নাবালিকার উদ্দেশে চিঠি লেখেন বিচারক। সেখানে জানান, আদালত তার কথা শুনেছে এবং তার আবেদনও গ্রহণ করেছে। যে ব্যক্তিকে সে ‘কাকা’ বলে ডাকত, তিনি আর কোনও দিন মুক্ত অবস্থায় বাইরে ঘুরে বেড়াতে পারবেন না—এই বার্তাই দেওয়া হয় চিঠিতে।
বিচারক নাবালিকাকে বোঝাতে চেয়েছেন, আদালত তার হারিয়ে যাওয়া শৈশব ফিরিয়ে দিতে না পারলেও তার নিরাপত্তা নিয়ে নিশ্চয়তা দিতে পারে। ভবিষ্যতে নিজের মতো করে জীবন কাটানোর জন্য তাকে উৎসাহও দিয়েছেন বিচারক। স্কুলে যাওয়া, বন্ধু তৈরি করা, হাসা, খেলা এবং নিজের স্বপ্নের দিকে এগিয়ে যাওয়ার বার্তা দেওয়া হয়েছে তাকে।
মামলার ঘটনাটি ঘটে ২০২৩ সালের জুলাইয়ে। তখন নাবালিকার বয়স ছিল সাত বছর। বর্তমানে তার বয়স দশ। মামলায় অভিযুক্ত সুমিত শাক্যকে বারো বছরের কম বয়সি শিশুর উপর গুরুতর যৌন নির্যাতন এবং ভয় দেখানোর অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা হয়।
নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে দিল্লি হাই কোর্টে আবেদন করেছিলেন অভিযুক্ত। সাজা স্থগিত করে জামিন দেওয়ার আবেদনও করা হয়েছিল। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে সেই আবেদন মঞ্জুর করেনি হাই কোর্ট। মামলার প্রমাণ এবং ফরেন্সিক তথ্য বিবেচনা করে সাজা স্থগিত করার ক্ষেত্রে আদালত আগ্রহ দেখায়নি।
মামলাটিতে নাবালিকার জন্য ১০ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করেছিল নিম্ন আদালত। দিল্লি হাই কোর্ট উত্তর-পশ্চিম দিল্লির জেলা আইনি পরিষেবা কর্তৃপক্ষকে সেই ক্ষতিপূরণের বিষয়টিও দেখার নির্দেশ দিয়েছে। বিচারকের লেখা চিঠিটিও নাবালিকা বা তার পরিবারের হাতে পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
হাই কোর্টের বিচারপতি প্রতিভা এম সিংহ এবং বিচারপতি দীনেশ ভট্টের বেঞ্চ নিম্ন আদালতের দেওয়া সাজা বহাল রেখেছে। একই সঙ্গে বিচারকের লেখা চিঠিকে নাবালিকার জন্য ‘সাহসের বার্তা’ হিসেবেও উল্লেখ করেছে আদালত। জেলা আইনি পরিষেবা কর্তৃপক্ষকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে চিঠি এবং ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এই মামলায় আদালতের বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, আইনি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি নির্যাতিত শিশুর মানসিক নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। রায়ের আনুষ্ঠানিক ভাষার বাইরে গিয়ে নাবালিকার সঙ্গে সরাসরি কথা বলার মাধ্যমে বিচারক তাকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছেন যে, তার সাহস এবং সত্য বলার সিদ্ধান্ত আদালতের কাছে গুরুত্ব পেয়েছে।
