নিজস্ব সংবাদদাতা, পুরুলিয়া— কুড়মি সমাজের আন্দোলন ঘিরে আগের সরকারের ভূমিকা নিয়ে তীব্র আক্রমণ শানালেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। রবিবার পুরুলিয়ার কড়াডি মাঠে আদিবাসী কুড়মি সমাজের করম মহাসমাবেশ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গিয়ে তাঁর অভিযোগ, তৃণমূল সরকার কুড়মি-সহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে বিরোধ তৈরি করে জঙ্গলমহলকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল। একই সঙ্গে কুড়মি আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া সমস্ত মামলা প্রত্যাহারের ঘোষণা করেন তিনি। কুড়মালি ভাষাকে সংবিধানের অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়াও দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার আশ্বাস দেন মুখ্যমন্ত্রী।
কড়াডির অনুষ্ঠানে শুভেন্দু বলেন, আগের সরকার নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য জঙ্গলমহলে বিভিন্ন সমাজের মধ্যে বিভাজন তৈরি করেছিল। তাঁর অভিযোগ, আন্দোলনকারীদের দমন করতে পুলিশকে ব্যবহার করা হয়েছিল এবং শিশু থেকে বৃদ্ধ— কাউকেই মামলা থেকে ছাড় দেওয়া হয়নি। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, ‘বারেবারে মিথ্যাচার, জঙ্গলমহলে মূলবাসীদের মধ্যে বিরোধ লাগানো, গ্রামে গ্রামে, ভাইয়ে ভাইয়ে, বোনে বোনে, বিভিন্ন সমাজের মধ্যে নানা মিথ্যা বলে একে অপরের বিরুদ্ধে লাগিয়ে গোটা জঙ্গলমহলকে বিচ্ছিন্ন করার অপচেষ্টা করেছে।
কুড়মি আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে শুভেন্দুর আরও অভিযোগ, আগের সরকার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি। আন্দোলনের সময়ে পুলিশি অত্যাচার এবং মিথ্যা মামলার মুখে পড়তে হয়েছিল কুড়মি সমাজের মানুষকে। সেই প্রেক্ষিতেই তাঁর ঘোষণা, কুড়মি আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে যত মামলা রয়েছে, সেগুলি প্রত্যাহারের ব্যবস্থা করা হবে।
কুড়মালি ভাষার স্বীকৃতির বিষয়েও বড় ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, কুড়মালি ভাষাকে অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু করা হবে এবং দ্রুত তা শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি রাজবংশী ভাষাকেও অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করার কথা জানান তিনি।

কুড়মি সমাজের উন্নয়নের জন্যও একাধিক ঘোষণা করেন শুভেন্দু। কুড়মি উন্নয়ন পর্ষদের জন্য ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা জানান তিনি। প্রয়োজনে এই বরাদ্দ আরও বাড়ানো হতে পারে বলেও জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। একই সঙ্গে পশ্চিমাঞ্চল উন্নয়ন দপ্তরের বরাদ্দ ১৬০০ কোটি টাকা জঙ্গলমহলের উন্নয়নে খরচ করার কথা জানান তিনি। আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর কুড়মি সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে নবান্নে বৈঠকের কথাও ঘোষণা করেন।
পুরুলিয়ার পরিকাঠামো নিয়েও একাধিক পরিকল্পনার কথা জানান মুখ্যমন্ত্রী। দ্রুত পুরুলিয়ায় বিমান ওঠানামা চালুর ব্যবস্থা করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি পুরুলিয়ার চিড়িয়াখানাকে নতুন করে সাজানোর এবং সেখানে চিতা আনার পরিকল্পনার কথাও জানান শুভেন্দু।
করম পরবের অনুষ্ঠানে শুভেন্দু বলেন, কোনও মুখ্যমন্ত্রী এর আগে কুড়মি সমাজের এই অনুষ্ঠানে যোগ দেননি। তাঁকে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য সমাজের প্রতিনিধিদের ধন্যবাদও জানান তিনি। অনুষ্ঠানে আদিবাসী কুড়মি সমাজের নেতা অজিত মাহাতোর পাশাপাশি ঝাড়খণ্ডের প্রাক্তন উপমুখ্যমন্ত্রী তথা আজসু প্রধান সুদেশ মাহাতোও উপস্থিত ছিলেন।
তবে অনুষ্ঠানের মঞ্চে পুরুলিয়ার তিন বিজেপি বিধায়ককে দেখা যায়নি। মানবাজার ও কাশীপুরের বিধায়কদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বান্দোয়ানের বিজেপি বিধায়ক লবসেন বাস্কে পরে জানান, অনুষ্ঠানের সঠিক সময় জানতে না পারায় তিনি কড়াডির করম নাচের অনুষ্ঠানে যেতে পারেননি। তবে মুখ্যমন্ত্রীর প্রশাসনিক বৈঠকে তাঁরা উপস্থিত ছিলেন।

কুড়মি সমাজের দীর্ঘদিনের দাবি, কুড়মিদের তফসিলি জনজাতি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা। সম্প্রতি রাজ্য সরকার এই দাবির বিষয়ে কেন্দ্রকে আরও একটি ‘ফারদার কমন জাস্টিফিকেশন রিপোর্ট’ পাঠানোর কথা জানিয়েছে। তার মধ্যেই করম পরবের মঞ্চ থেকে মামলা প্রত্যাহার, ভাষার সাংবিধানিক স্বীকৃতি এবং উন্নয়ন পর্ষদের বরাদ্দ নিয়ে একগুচ্ছ ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী।
