September 17, 2026
রাজ্য

কারখানার হাত ধরেই বাংলায় বিশ্বকর্মা পুজোর উত্থান

সংবাদ কলকাতা: বাংলার শিল্পাঞ্চলের সঙ্গে বিশ্বকর্মা পুজোর সম্পর্ক আজকের নয়। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে হাওড়া ও হুগলির জুটমিলগুলিতে শ্রমিকদের হাত ধরেই আধুনিক শিল্পক্ষেত্রে বিশ্বকর্মা পুজোর নতুন রূপের সূচনা হয়েছিল। প্রথমদিকে দেবতার মূর্তি নয়, যন্ত্রপাতি ও কাজের সরঞ্জামকেই সামনে রেখে পুজো করার চল ছিল। সময়ের সঙ্গে সেই রীতি বদলে গিয়ে বিশ্বকর্মা হয়ে ওঠেন কারখানা ও যন্ত্রের দেবতা।

ঔপনিবেশিক আমলের সরকারি নথি এবং গবেষকদের বক্তব্য থেকে জানা যায়, হাওড়া ও হুগলির জুটমিলগুলিতে কর্মরত বাঙালি ও বিহারি শ্রমিকদের মধ্যে যন্ত্রপুজোর মাধ্যমেই বিশ্বকর্মা আরাধনার এই ধারা জনপ্রিয় হয়। ভারতীয় উৎসব নিয়ে লেখার সময় ব্রিটিশ লেখক এম এম আন্ডারহিলও উল্লেখ করেছিলেন, কোথাও কোথাও বিশ্বকর্মাকে শুধু একটি ঘট হিসেবে পুজো করা হত। তার সামনে সাজিয়ে রাখা হত বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও কাজের সরঞ্জাম।

উনিশ শতকের শেষভাগ পেরিয়ে বিশ শতকের গোড়ায় কলকাতা যখন বিশ্বের অন্যতম প্রধান পাটশিল্পকেন্দ্র হয়ে উঠছে, তখন বিশ্বকর্মার পুজোর ধরনও বদলাতে শুরু করে। ধীরে ধীরে ঘটের জায়গা নেয় মূর্তি। পরিচ্ছন্ন, দাড়িহীন এক পুরুষ দেবতার রূপে বিশ্বকর্মার মূর্তি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

সংস্কৃতি গবেষক এবং প্রাক্তন কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি সচিব জহর সরকার জানিয়েছেন, উনিশ শতকে বাঙালিরা দু’টি পুজোকে নতুন সামাজিক গুরুত্ব দিয়েছিলেন—শিক্ষার সঙ্গে সরস্বতী পুজো এবং নতুন শিল্পব্যবস্থার সঙ্গে বিশ্বকর্মা পুজো। তাঁর ব্যাখ্যায়, ১৯০০ থেকে ১৯১০ সালের মধ্যে যন্ত্রপাতিকে ঘিরে চলা পুজোয় ধীরে ধীরে বিশ্বকর্মার মূর্তির সংযোজন ঘটে।

ভারতে প্রথম জুটমিল হিসেবে রিষড়ার অ্যাকল্যান্ড মিলের নাম উঠে আসে। ১৮৫৫ সালে ব্রিটিশ উদ্যোগপতি জর্জ অ্যাকল্যান্ড এবং বাঙালি অর্থলগ্নিকারী বাবু বিসম্বর সেনের সহযোগিতায় কলকাতার উপকণ্ঠে এই মিল গড়ে ওঠে। ১৮৭০ সাল পর্যন্ত পাটশিল্পের বৃদ্ধি তুলনামূলক ধীর থাকলেও পরের দশকে শিল্পের বিস্তার দ্রুত হয়। ১৮৭১ থেকে ১৮৭৫ সালের মধ্যেই ১৮টি নতুন জুটমিল তৈরি হয়েছিল।

ক্রমশ পাটশিল্প বিনিয়োগকারীদের কাছে অত্যন্ত লাভজনক শিল্পে পরিণত হয়। ১৮৭৩ সালে বরানগর জুটমিলের শেয়ার ৬৮ শতাংশ প্রিমিয়ামে বিক্রি হয়েছিল বলে ঐতিহাসিক তথ্য থেকে জানা যায়। সংস্থাটি শেয়ারহোল্ডারদের অর্ধবার্ষিক ২৫ শতাংশ লভ্যাংশও দিয়েছিল।

বিশ শতকের গোড়ায় এই শিল্প আরও বড় আকার নেয়। ১৯১০ সালের মধ্যে ভারতে ৩৮টি জুট সংস্থা ১৪০টিরও বেশি মিল পরিচালনা করছিল। মোট তাঁতের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩০ হাজার। বিপুল পরিমাণ পাটজাত কাপড় ও বস্তা বিদেশে রপ্তানি হত। আর এই বিশাল শিল্পব্যবস্থার সঙ্গে ক্রমশ জড়িয়ে যায় বিশ্বকর্মা পুজো।

জুটমিলের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বকর্মা পুজো ছড়িয়ে পড়ে বাংলার অন্যান্য কারখানাতেও। ইঞ্জিনিয়ারিং সংস্থা, যন্ত্রচালিত তুলোর মিল, রাসায়নিক এবং ওষুধ তৈরির কারখানাতেও এই পুজো জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। স্যার আর এন মুখার্জির প্রতিষ্ঠিত মার্টিন অ্যান্ড বার্নের মতো ইঞ্জিনিয়ারিং সংস্থা থেকে হুগলি ও কলকাতার বঙ্গ লক্ষ্মী কটন মিলস—বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানেই বিশ্বকর্মা পুজো জায়গা করে নেয়।

স্বদেশি যুগের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলির কাছেও এই পুজোর আলাদা তাৎপর্য ছিল। ১৯৩৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ইস্ট ইন্ডিয়া ফার্মাসিউটিক্যালসের ম্যানেজিং ডিরেক্টর সাতরূপা মুখার্জি জানিয়েছেন, তাঁদের কারখানায় প্রায় ৭৫ বছর ধরে বিশ্বকর্মা পুজো হয়ে আসছে। সংস্থাটি তৈরি করেছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী অশোক কুমার সেন এবং হীরেন্দ্রনাথ দত্তগুপ্ত।স্বদেশি সংস্থাগুলির কাছে বিশ্বকর্মা পুজো

ছিল দেশের শিকড় ও ঐতিহ্যের সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক তুলে ধরার একটি মাধ্যম। অন্যদিকে ইউরোপীয় মালিকানাধীন বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলির কাছে শ্রমিকদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রেও এই পুজোর ভূমিকা ছিল বলে গবেষকদের মত।

সাধারণত পঞ্জিকা অনুযায়ী ১৭ বা ১৮ সেপ্টেম্বর বিশ্বকর্মা পুজো হয়ে থাকে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলির কাজের সময়সূচির উপরও দিন নির্ধারণের বিষয়টি অনেক ক্ষেত্রে নির্ভর করে। পুজোর দিন বহু কারখানায় যন্ত্র বন্ধ রাখা হয়। মেশিন ও কাজের সরঞ্জাম পরিষ্কার করে সাজিয়ে রাখা হয়। মেকানিক, চালক, কারিগর থেকে শুরু করে শিল্পশ্রমিক—সকলেই তাঁদের জীবিকার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত যন্ত্রপাতিকে সামনে রেখে পুজোয় অংশ নেন।

তবে বিশ্বকর্মার ইতিহাস শুধুমাত্র আধুনিক শিল্পের সঙ্গে শুরু হয়নি। ঋগ্বেদে বিশ্বকর্মাকে এক মহাজাগতিক সৃষ্টিকর্তা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তী পুরাণগুলিতে তাঁর পরিচয় আরও বিস্তৃত হয়। পুরাণের কাহিনি অনুযায়ী, লঙ্কা, দ্বারকা ও ইন্দ্রপ্রস্থের মতো নগর, দেবতাদের প্রাসাদ ও অস্ত্র এবং পুষ্পক রথ নির্মাণের সঙ্গেও বিশ্বকর্মার নাম জড়িয়ে রয়েছে। সেই কারণেই পরবর্তী সময়ে তিনি ‘দেবশিল্পী’ বা ‘দিব্য ইঞ্জিনিয়ার’-এর মর্যাদা পান।

মধ্যযুগে সোনার কারিগর, কামার, ছুতোর, রাজমিস্ত্রি, ভাস্কর-সহ বিভিন্ন কারুশিল্পী গোষ্ঠীর মধ্যে বিশ্বকর্মার আরাধনা চালু ছিল। কিন্তু উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বাংলায় যখন জুটমিল, কারখানা, রেলওয়ে ওয়ার্কশপ এবং ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প দ্রুত বাড়তে শুরু করল, তখন তৈরি হল নতুন এক শ্রমজীবী সমাজ। সেই সমাজের জীবনের সঙ্গে যন্ত্রের সম্পর্ক ছিল অবিচ্ছেদ্য।

আর সেই পরিবর্তনের সঙ্গেই বিশ্বকর্মা পুজোও গিল্ড বা নির্দিষ্ট কারিগর গোষ্ঠীর পুজো থেকে ধীরে ধীরে আধুনিক কারখানার যন্ত্রপুজোয় পরিণত হয়। বাংলার শিল্পাঞ্চলের হাত ধরে বিশ্বকর্মা হয়ে ওঠেন আধুনিক মেশিন ও শিল্পশ্রমের দেবতা।

Related posts

Leave a Comment