September 17, 2026
রাজ্য

আইএমএ-র পুরনো হিসাব নিয়ে বিতর্ক, মুখোমুখি সুদীপ্ত ও শান্তনু

সংবাদ কলকাতা: ভুয়ো চিকিৎসকদের নাম রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলের নথিতে কী ভাবে উঠল, সেই প্রশ্নের তদন্ত দাবি করে অভিযোগ জমা পড়ার পরই ফের উত্তপ্ত হয়েছে তৃণমূলের চিকিৎসক নেতাদের অভ্যন্তরীণ সংঘাত। রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলের সভাপতি সুদীপ্ত রায় (Sudipta Ray) আইএমএ (Indian Medical Association)-র একটি পুরনো ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের হিসাব নিয়ে প্রাক্তন রাজ্যসভার সাংসদ শান্তনু সেন (Shantanu Sen)-কে ঘিরে প্রশ্ন তুলেছেন। শান্তনুর পাল্টা দাবি, মেডিক্যাল কাউন্সিল নিয়ে তিনি সরব হওয়ার কারণেই পুরনো কাসুন্দি ফের ঘাঁটা হচ্ছে।

বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে আইএমএ-র জার্নাল জিমা (Journal of the Indian Medical Association)-র নামে খোলা একটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট। অভিযোগ, ২০১৫ সালে আইএমএ-র স্থায়ী হিসাব নম্বর ব্যবহার করে অ্যাকাউন্টটি খোলা হলেও সংগঠনের সদর দপ্তরকে বিষয়টি জানানো হয়নি। অ্যাকাউন্ট পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন তৎকালীন সম্পাদক শান্তনু সেন এবং যুগ্ম অর্থসচিব উজ্জ্বল সেনগুপ্ত (Ujjal Sengupta)।

তিন বছরে ওই অ্যাকাউন্টে প্রায় এক কোটি ৫৩ লক্ষ টাকা জমা পড়েছিল বলে তদন্তে উঠে আসে। সেখান থেকে প্রায় এক কোটি ৩২ লক্ষ টাকা তোলা হয়। এর মধ্যে প্রায় ২৯ লক্ষ টাকা নগদে তোলার অভিযোগ রয়েছে। পরে অ্যাকাউন্টের নিয়মবহির্ভূত পরিচালনা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

২০২০ সালে দুটি চেক ব্যাঙ্কে জমা দেওয়ার পর বিষয়টি সামনে আসে। একটি ১৭ লক্ষ টাকা এবং অন্যটি এক লক্ষ টাকার চেক ছিল। ব্যাঙ্কের নিয়ম অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় অন্তর অ্যাকাউন্টের স্বাক্ষরকারী পরিবর্তন হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি বলে অভিযোগ। সেই কারণে চেকগুলি ফেরত যায়।

এর পর আইএমএ তদন্ত কমিটি (IMA Inquiry Committee) গঠন করে। কমিটি কলকাতায় এসে সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষক ও আধিকারিকদের জিজ্ঞাসাবাদ করে। তদন্ত রিপোর্টে অ্যাকাউন্টটির বিষয় গোপন রাখার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকদের ভয় দেখানোর অভিযোগের উল্লেখ করা হয় বলে দাবি। এমনকি জিমা-র অডিটর (Auditor)-কেও অ্যাকাউন্টটির কথা জানানো হয়নি বলে তদন্তে উঠে আসে।

তদন্তে ‘দিশা মেডিহেল্প’ (Disha Medihelp) নামে একটি সংস্থাকে দেওয়া ১৭ লক্ষ টাকার চেক নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। চেকের পিছনে থাকা মোবাইল নম্বর শান্তনু সেনের সঙ্গে যুক্ত বলে তদন্তকারীরা জানতে পেরেছিলেন বলে অভিযোগ। ওই সংস্থার সঙ্গে তাঁর কার্যালয়ের সম্পর্ক রয়েছে বলেও তদন্তে দাবি করা হয়।

সুদীপ্ত রায়ের বক্তব্য, তদন্ত রিপোর্টে যদি গুরুতর অনিয়মের কথা উল্লেখ থাকে, তা হলে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন, সেই প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন। তাঁর আরও প্রশ্ন, আইএমএ-র মূল আয়ব্যয়ের হিসাবের মধ্যে এই অ্যাকাউন্টের লেনদেনের উল্লেখ ছিল না কেন।

শান্তনু সেন অবশ্য অভিযোগের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। তাঁর দাবি, রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিল (West Bengal Medical Council) নিয়ে প্রশ্ন তোলার পরেই তাঁর বিরুদ্ধে পুরনো অভিযোগ সামনে আনা হচ্ছে। তিনি সুদীপ্তের বিরুদ্ধে অতীতেও ব্যক্তিগত ও সাংগঠনিক ভাবে ক্ষতি করার চেষ্টা করার অভিযোগ তুলেছেন।

এর মধ্যেই পাঁচ ভুয়ো চিকিৎসক (Fake Doctors) ধরা পড়ার ঘটনা নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। অভিযোগ, ভিন্‌রাজ্য থেকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ডিগ্রি নেওয়ার দাবি করা কয়েক জন ব্যক্তি কী ভাবে রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলে নাম নথিভুক্ত করানোর সুযোগ পেলেন, তা খতিয়ে দেখা দরকার। এই ঘটনায় বিধাননগর পুলিশ কমিশনারেটে অভিযোগ জমা পড়েছে। সেখানে সুদীপ্ত রায়, সুশান্ত রায় (Sushanta Ray), নির্মল মাজি (Nirmal Maji), মানস চক্রবর্তী (Manas Chakraborty)-সহ সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের ভূমিকা তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।

ফলে এক দিকে ভুয়ো চিকিৎসকদের রেজিস্ট্রেশন নিয়ে রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলের ভূমিকা প্রশ্নের মুখে, অন্য দিকে আইএমএ-র পুরনো অ্যাকাউন্টের আর্থিক লেনদেন নিয়ে ফের বিতর্ক শুরু হয়েছে। দুটি বিষয়কে কেন্দ্র করে সুদীপ্ত ও শান্তনুর পাল্টাপাল্টি অভিযোগে তৃণমূলের চিকিৎসক সংগঠনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বও ফের প্রকাশ্যে এসেছে।

আইএমএ-র তদন্ত কমিটির প্রাক্তন প্রধান অজয় কুমার (Ajay Kumar) জানিয়েছেন, তাঁরা তদন্ত করে রিপোর্ট জমা দিয়েছেন। রিপোর্টে কী পাওয়া গিয়েছিল, তা স্পষ্ট ভাবে লেখা রয়েছে। এরপর ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি সংগঠনের বর্তমান নেতৃত্বের।

এদিকে শান্তনুর দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ২১ লক্ষ ৭৩ হাজার ৮৪৯ টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সুদীপ্ত শিবিরের প্রশ্ন, বাকি প্রায় এক কোটি ৩২ লক্ষ টাকার হিসাব কোথায়। সেই হিসাব এবং তদন্ত রিপোর্টের ভিত্তিতে আইএমএ ভবিষ্যতে কোনও পদক্ষেপ করবে কি না, এখন সেটিই মূল প্রশ্ন।

Related posts

Leave a Comment