সংবাদ কলকাতা: ধর্মকে ‘আফিং’ বলা এবং নিজেদের নাস্তিক পরিচয় দেওয়া বামেদের কাছ থেকে ধর্মাচরণ নিয়ে কোনও উপদেশ নেওয়া হবে না বলে কড়া বার্তা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সোমবার গণেশ পুজোর সূচনা করে বামেদের বিরুদ্ধে সরব হন তিনি। একই সঙ্গে বাগেশ্বর বাবা বিতর্ক, পুজোর রীতি-নীতি এবং গণেশ পুজোর বিস্তার নিয়ে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী।
বাগেশ্বর বাবা বিতর্ক প্রসঙ্গে শুভেন্দুর বক্তব্য, সনাতন ধর্মের পুজো-পার্বণের নিয়মকানুন সম্পর্কে সনাতনীরাই জানেন। কখন নিরামিষ খাবার গ্রহণ করতে হয়, আবার কখন মাছ দিয়ে দেবীকে ভোগ দিতে হয়, সেই সিদ্ধান্ত ধর্মীয় রীতি মেনেই হয়ে থাকে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তাঁর অভিযোগ, অতীতে পুজোর পদ্ধতি, পুজোপাঠ এবং পঞ্জিকার নিয়ম বদলে দিয়ে অনেক সময় তাকে শুধুমাত্র ‘কালচারাল প্রোগ্রাম’ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা হয়েছে।
শুভেন্দু বলেন, ‘আগে পুজো পদ্ধতি, পুজো পাঠ, পঞ্জিকা নিয়ম বদলে দিয়ে বলা হত, কালচারাল প্রোগ্রাম। কেউ বা কারা প্রাদেশিকতার নামে বিভাজন করতে চেয়েছিল।’
ধর্ম নিয়ে বামেদের অবস্থানকেও এদিন নিশানা করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, যাঁরা ধর্মকে আফিং বলেন এবং নিজেদের নাস্তিক বলে পরিচয় দেন, তাঁদের কাছ থেকে ধর্ম নিয়ে কোনও উপদেশ নেওয়ার প্রয়োজন নেই। ধর্মীয় বিশ্বাস ও সনাতন সংস্কৃতির বিষয়ে সাধারণ মানুষ নিজেরাই সিদ্ধান্ত নেবেন বলে বার্তা দেন তিনি।
গণেশ পুজোর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি নিয়েও সমালোচকদের জবাব দেন শুভেন্দু। কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন, গণপতি মূলত মহারাষ্ট্রের পুজো হলে বাংলায় এত বেশি গণেশ পুজো হচ্ছে কেন। সেই প্রশ্নের জবাবে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, গণেশ পুজোর বিস্তার আসলে সনাতনীদের ঐক্যের প্রকাশ।
তাঁর কথায়, ‘বলছে গণপতি তো মহারাষ্ট্রের পুজো। এখানে এত হচ্ছে কেন? আমি বললাম, এটাই তো সনাতনীদের ঐক্য। মাঝখানে আপনারা একটা প্রাচীর রেখেছিলেন। মারাঠি, গুজরাতি, বিহারি সবাই বাহারি বলে একটা প্রাচীর তুলে রাখা হয়েছিল। প্রাচীরটা আমরা ভেঙে দিয়েছি, আপনারা ভেঙে দিয়েছেন।’
এর আগে বালিগঞ্জে ভারত সেবাশ্রম সংঘের পুজোর সূচনা করেও পুজো ও শারদোৎসব নিয়ে বিতর্কে বামেদের কটাক্ষ করেন শুভেন্দু। কমিউনিস্টদের নবান্নে এসে পুষ্পাঞ্জলি দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়ে তিনি বলেন, বিশ্বকর্মা পুজোর দিন নবান্নে পুষ্পাঞ্জলি দেবেন তিনি। বামেদেরও সেখানে এসে তাঁর সঙ্গে পুষ্পাঞ্জলি দেওয়ার আহ্বান জানান মুখ্যমন্ত্রী।

শুভেন্দুর বক্তব্য, ‘অনেকের খুব কষ্ট হচ্ছে, মূলত কমিউনিস্ট ঘরানার যাঁরা। মানে যাঁদের পুজো বলতে খুব কষ্ট। খুব গালাগালি করছে আমাকে। বলছে, পুজো কেন লিখতে হবে। কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের বলব, আমি বিশ্বকর্মা পুজোর দিন নবান্নতে পুষ্পাঞ্জলি দেব। আপনারা নবান্নতে আসুন। একসঙ্গে সবাই মিলে বিশ্বকর্মী ঠাকুরের সামনে পুষ্পাঞ্জলি দিই। খুব ভালো লাগবে। পরিবর্তনের স্বাদ আপনারাও পাবেন।’
পুজো নিয়ে এই রাজনৈতিক টানাপড়েনের মধ্যেই শুভেন্দুর মন্তব্যকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে পুজোর আয়োজন, সরকারি স্তরে পুজোর সূচনা এবং বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কের আবহে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য নতুন করে রাজনৈতিক চাপানউতোর তৈরি করতে পারে।
পাশাপাশি পিতৃপক্ষে দুর্গাপুজোর সূচনা নিয়েও বিগত আমলের প্রসঙ্গ তুলে কটাক্ষ করেন শুভেন্দু। তাঁর বক্তব্য, পিতৃপক্ষ নিয়ে অযথা বিতর্ক তৈরি করার প্রয়োজন নেই। ‘পিতৃপক্ষে কাঁচি নিয়ে বের হওয়ার কোনও প্রয়োজন নেই’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এর পরেই দেশবিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে সতর্ক থাকার বার্তা দেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর কথায়, ‘অসুরদের থেকে সাবধানে থাকতে হবে। দূরে থাকতে হবে। দেশবিরোধী শক্তি, টুকরে টুকরে গ্যাং থেকে দূরে থাকতে হবে।’
গণেশ পুজো থেকে দুর্গাপুজো—ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে বাংলার রাজনৈতিক পরিসরে যে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সোমবারের একাধিক কর্মসূচিতে সেই প্রসঙ্গেই সরব হন শুভেন্দু। ধর্মীয় সংস্কৃতির সঙ্গে বাঙালির সামাজিক জীবনের সম্পর্ক তুলে ধরে তিনি একদিকে যেমন বামেদের আক্রমণ করেন, তেমনই সনাতনীদের মধ্যে সাংস্কৃতিক ঐক্যের বার্তাও দেন।
