34 C
Kolkata
September 15, 2026
দেশ

দেশভাগের ক্ষত পেরিয়ে রামগড়ে আজও বেঁচে ৩১০ বছরের ঘটকবাড়ির দুর্গাপুজো

নিজস্ব সংবাদদাতা, রামগড়— বাঙালির ইতিহাসে দেশভাগ এক গভীর ক্ষত। সেই ক্ষতের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য পরিবারের বিচ্ছেদ, ভিটেমাটি হারানোর স্মৃতি এবং সংস্কৃতির শিকড় আঁকড়ে থাকার গল্প। সেই ইতিহাসেরই এক অনন্য সাক্ষী রামগড়ের ঘটকবাড়ির দুর্গাপুজো। ওপার বাংলার ফরিদপুর থেকে এপার বাংলায় এসে আজও নিয়ম-নিষ্ঠায় পূজিত হচ্ছেন ঘটক পরিবারের দুর্গা। প্রায় ৩১০ বছরের এই পুজো শুধু ধর্মীয় আচার নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দেশভাগ, দুই বাংলার সাংস্কৃতিক যোগ, পারিবারিক আবেগ এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ঐতিহ্য ধরে রাখার কাহিনি।

প্রায় তিন শতাব্দীরও বেশি সময় আগে ঘটক পরিবারের পূর্বপুরুষদের হাত ধরে দেবী দুর্গার আরাধনা শুরু হয়েছিল ফরিদপুরে। সেই সময়ের সামাজিক ও পারিবারিক পরিমণ্ডলে শুরু হওয়া পুজো ক্রমে পরিবারের অন্যতম প্রধান ঐতিহ্যে পরিণত হয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একই বিশ্বাস, ভক্তি ও পারিবারিক সংস্কারকে সঙ্গে নিয়ে দুর্গোৎসবের আয়োজন করে আসছেন পরিবারের সদস্যরা।

সময় বদলেছে। বদলেছে ভৌগোলিক সীমানাও। কিন্তু বদলায়নি দেবীর প্রতি পরিবারের টান। দেশভাগের সময় ফরিদপুরের ভিটেমাটি ছেড়ে যখন পরিবারের সদস্যদের এপারে চলে আসতে হয়, তখন তাঁদের সঙ্গে চলে আসে বহু পুরনো স্মৃতি ও সংস্কৃতির উত্তরাধিকার। সেই উত্তরাধিকারেরই অন্যতম অংশ হয়ে রামগড়ে নতুন করে জায়গা করে নেয় ঘটকবাড়ির দুর্গাপুজো।


দেশভাগ শুধু মানচিত্রের বিভাজন ছিল না। এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল মানুষের ঘরবাড়ি, সম্পর্ক, পারিবারিক স্মৃতি এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়। ঘটক পরিবারের ক্ষেত্রেও সেই পরিবর্তনের সাক্ষী দুর্গাপুজো। ওপার বাংলার ফরিদপুরে যে দেবীর আরাধনা শুরু হয়েছিল কয়েক শতাব্দী আগে, সেই পুজোই পরবর্তীকালে এপার বাংলায় এসে নতুন ঠিকানা পেয়েছে।

আজ রামগড়ের বাড়িতে সেই প্রাচীন ঐতিহ্যই ধরে রেখেছেন পরিবারের বর্তমান প্রজন্ম। পুজোর কয়েকটি দিন দূরদূরান্তে ছড়িয়ে থাকা পরিবারের সদস্যরা একে একে এসে হাজির হন। বাড়ি ভরে ওঠে আত্মীয়-পরিজনে। দেবীর আরাধনার পাশাপাশি চলে পরিবারের পুনর্মিলন, আনন্দ-আড্ডা এবং পুরনো দিনের স্মৃতিচারণ।

বর্তমান প্রজন্মের পুজোর অন্যতম আয়োজক প্রসেনজিৎ ঘটক জানান, পুজোর কয়েকটা দিন পরিবারের সদস্যরা দূরদূরান্ত থেকে রামগড়ের বাড়িতে এসে একসঙ্গে থাকেন। সকলেই মেতে ওঠেন আনন্দময়ীর উৎসবে। তাঁর কথায়, এই পুজো পরিবারের কাছে শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, প্রজন্মের সঙ্গে প্রজন্মকে জুড়ে রাখার এক গুরুত্বপূর্ণ বন্ধন।

প্রায় ৩১০ বছরের পথ পেরিয়ে আজও তাই ঘটকবাড়ির দুর্গাপুজো একই সঙ্গে ইতিহাস এবং বর্তমানের সেতুবন্ধন। দেশভাগের মতো কঠিন সময়ও এই পারিবারিক ঐতিহ্যকে মুছে দিতে পারেনি। বরং ওপার বাংলা থেকে এপার বাংলায় দেবীর আগমন সেই ইতিহাসকে আরও গভীর করে তুলেছে।

দুই বাংলার সাংস্কৃতিক সম্পর্ক, দেশভাগের স্মৃতি এবং পারিবারিক উত্তরাধিকারের মেলবন্ধন ঘটেছে এই পুজোয়। তাই শরতের আকাশে ঢাকের বাদ্যি বেজে উঠলেই রামগড়ের ঘটকবাড়িতে শুধু দেবীর আরাধনা হয় না, ফিরে আসে বহু প্রজন্মের পুরনো স্মৃতি। ফিরে আসে ফরিদপুরের ভিটে, হারিয়ে যাওয়া সময় এবং সেই শিকড়ের টান, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পরিবারকে এক সুতোয় বেঁধে রেখেছে।

Related posts

Leave a Comment