সংবাদ বিনোদন— ১১ সেপ্টেম্বর এলেই ফিরে আসে ২০০১ সালের সেই ভয়াবহ দিনটির স্মৃতি। নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ারে সন্ত্রাসী হামলা শুধু আমেরিকাকেই বদলে দেয়নি, বদলে দিয়েছিল গোটা বিশ্বের রাজনীতি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের সমীকরণ। হলিউডে এই ঘটনা নিয়ে তৈরি হয়েছে অসংখ্য ছবি। তবে বলিউডও ৯/১১-র অভিঘাতকে দেখেছে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে। পরিচয়, ধর্মীয় বিদ্বেষ, সন্দেহ, আতঙ্ক এবং মানবিক সম্পর্ক—ভারতীয় চরিত্রের চোখ দিয়ে সেই পরবর্তী সময়ের গল্প বলেছে একাধিক হিন্দি ছবি। ৯/১১-কে ঘিরে তৈরি এমনই পাঁচটি উল্লেখযোগ্য ছবি জেনে নেওয়া যাক।
১. ‘মাই নেম ইজ খান’ (২০১০)
৯/১১-পরবর্তী সময়কে নিয়ে বলিউডের সবচেয়ে পরিচিত ছবিগুলির মধ্যে অন্যতম করণ জোহরের ‘মাই নেম ইজ খান’। শাহরুখ খান অভিনীত রিজওয়ান খান অ্যাসপারগার্স সিনড্রোমে আক্রান্ত এক ব্যক্তি, যিনি আমেরিকায় গিয়ে এক হিন্দু মহিলাকে বিয়ে করেন।
কিন্তু ৯/১১-র পর তাঁর পরিবারের জীবন সম্পূর্ণ বদলে যায়। শুধুমাত্র মুসলিম পরিচয়ের কারণে সন্দেহ, বিদ্বেষ এবং সামাজিক হেনস্থার মুখে পড়তে হয় তাঁদের। এরপর নিজের পরিচয় ও নির্দোষিতা প্রমাণ করতে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দেখা করার উদ্দেশ্যে আমেরিকার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাত্রা শুরু করেন রিজওয়ান।
ছবিটি বাণিজ্যিক ভাবে বিপুল সাফল্য পাওয়ার পাশাপাশি ইসলামোফোবিয়া বা মুসলিমবিদ্বেষের মতো বিষয়কে মূলধারার ভারতীয় সিনেমার আলোচনায় নিয়ে আসে।
২. ‘নিউ ইয়র্ক’ (২০০৯)
কবীর খান পরিচালিত ‘নিউ ইয়র্ক’ ছবির কেন্দ্রে রয়েছে তিন ভারতীয় বন্ধুর গল্প। ৯/১১-র আগে নিউইয়র্কে তাঁদের জীবন ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু টুইন টাওয়ারে হামলার পর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ পাল্টে যায়।
তাঁদের মধ্যে একজনকে সন্ত্রাসবাদের সন্দেহে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ ও নির্যাতন করা হয়। এরপর বন্ধুত্ব, বিশ্বাস এবং প্রতিশোধের গল্পের মধ্য দিয়ে সামনে আসে ৯/১১-পরবর্তী আমেরিকায় মুসলিম ও দক্ষিণ এশীয় মানুষের প্রতি সন্দেহের পরিবেশ।
ছবিটি দেখিয়েছিল, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের নামে সন্দেহভাজনদের সঙ্গে আচরণ কীভাবে একজন সাধারণ মানুষের জীবনকে আমূল বদলে দিতে পারে।
৩. ‘কুরবান’ (২০০৯)
সইফ আলি খান ও করিনা কাপুর খান অভিনীত ‘কুরবান’ ৯/১১-পরবর্তী সন্ত্রাসবাদ ও সন্দেহের আবহকে একটি থ্রিলারের মোড়কে তুলে ধরে। ছবিতে এক তরুণী এক ব্যক্তির প্রেমে পড়ে তাঁর সঙ্গে আমেরিকায় পাড়ি দেন। সেখানে গিয়ে ধীরে ধীরে জানতে পারেন, তাঁর আশপাশের কিছু মানুষ ভয়াবহ সন্ত্রাসবাদী পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত।
প্রেম ও পারিবারিক সম্পর্কের পাশাপাশি ছবিতে উঠে আসে বিশ্বাস, আনুগত্য, ধর্মীয় পরিচয় এবং উগ্রপন্থার প্রশ্ন। ৯/১১-র পর তৈরি হওয়া আতঙ্ক ও সন্দেহের পরিবেশই ছবির গল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।
৪. ‘ইউঁ হোতা তো ক্যায়া হোতা’ (২০০৬)
নাসিরুদ্দিন শাহ পরিচালিত এই ছবিটি ৯/১১ নিয়ে তৈরি প্রথম দিকের হিন্দি ছবিগুলির অন্যতম। ২০০৬ সালে মুক্তি পাওয়া ছবিটির গল্পে একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা কয়েকজন ভারতীয় চরিত্রকে দেখানো হয়েছে, যাঁরা একই বিমানে আমেরিকার উদ্দেশে যাত্রা করেন।
সেই বিমানই ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার দিনে ছিনতাই হয়ে যায়। ছবিটি বিভিন্ন চরিত্রের ব্যক্তিগত জীবন, তাঁদের স্বপ্ন এবং যাত্রার গল্প আলাদা আলাদা ভাবে তুলে ধরে। শেষ পর্যন্ত সেই গল্পগুলি এক ভয়াবহ পরিণতির জায়গায় এসে মিশে যায়।
অন্যান্য ছবির তুলনায় ‘ইউঁ হোতা তো ক্যায়া হোতা’ হয়তো কম আলোচিত। কিন্তু ৯/১১-র এত অল্প সময়ের মধ্যেই ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে একটি পূর্ণাঙ্গ হিন্দি ছবি তৈরি করে সে সময়ের সিনেমায় গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত তৈরি করেছিল।

৫. ‘তেরে বিন লাদেন’ (২০১০)
৯/১১-পরবর্তী সময়ের গল্প মানেই যে শুধু গম্ভীর রাজনৈতিক বা মানবিক নাটক হতে হবে, তা নয়। তারই অন্য উদাহরণ ‘তেরে বিন লাদেন’। এই ব্যঙ্গাত্মক কমেডিতে এক তরুণ পাকিস্তানি সাংবাদিকের গল্প বলা হয়েছে, যে আমেরিকায় যাওয়ার ভিসা পাওয়ার এবং নিজের কেরিয়ার তৈরির মরিয়া চেষ্টায় ওসামা বিন লাদেনের মতো দেখতে এক ব্যক্তিকে খুঁজে বের করে।
এরপর সেই ব্যক্তিকে সামনে রেখে ভুয়ো সাক্ষাৎকার তৈরির পরিকল্পনা করে সে। হাস্যরসের মাধ্যমে ছবিটি ৯/১১-পরবর্তী মিডিয়া উন্মাদনা, সন্ত্রাসবাদ নিয়ে আতঙ্ক এবং আমেরিকার ভিসা নীতির নানা দিককে ব্যঙ্গ করেছে।
৯/১১-র ঘটনা বিশ্ব রাজনীতির গতিপথ বদলে দিয়েছিল। সেই অভিঘাতের প্রতিফলন শুধু আন্তর্জাতিক রাজনীতি বা সংবাদমাধ্যমেই নয়, ভারতীয় সিনেমাতেও দেখা গিয়েছে। কখনও ইসলামোফোবিয়ার বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলে, কখনও রাষ্ট্রীয় সন্দেহ ও নির্যাতনের গল্প বলে, আবার কখনও ব্যঙ্গের মাধ্যমে—এই ছবিগুলি ৯/১১-পরবর্তী বিশ্বের একাধিক অস্বস্তিকর বাস্তবতাকে পর্দায় তুলে ধরেছে।
