সংবাদ কলকাতা: সরকার বদলের মাত্র চার মাসের মধ্যেই পশ্চিমবঙ্গে শিল্প ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ ফিরেছে বলে দাবি করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শুক্রবার সল্টলেক সিটি সেন্টারে ‘বাজার্স স্টাইল রিটেইল লিমিটেড’-এর উদ্যোগে বিশ্বের বৃহত্তম ফ্যাশন ওয়ার্ডরোবের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে রাজ্যে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের একাধিক পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, আগামী তিন বছরে সংস্থাটি পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে। পাশাপাশি নতুন ১৪০টি স্টোর খোলা এবং পুরুলিয়ায় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরির পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে শুভেন্দু বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই রাজ্যে শিল্প ও ব্যবসার অনুকূল পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তাঁর দাবি, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত চার মাসে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে একাধিক কর্মসূচির মাধ্যমে সেই পরিস্থিতি বদলানোর চেষ্টা হয়েছে। তাঁর কথায়, বাংলায় আবার শিল্প ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি হচ্ছে।
নতুন কর্মসংস্থানের সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, বর্তমানে দেশের ১০টি রাজ্যে সংস্থাটির ২৭৫টি স্টোর রয়েছে। সেখানে প্রায় ৬ হাজার মানুষ সরাসরি কাজ করেন। এর বাইরে প্রায় ৭৫ হাজার পরোক্ষ কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে এবং ৮২৫টি এমএসএমই সংস্থা তাদের সঙ্গে কাজ করছে। বর্তমানে সংস্থাটির মোট বিনিয়োগ প্রায় ১,৯০০ কোটি টাকা এবং আগামী তিন বছরে সেই বিনিয়োগ বাড়িয়ে ৫ হাজার কোটি টাকা করার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

পশ্চিমবঙ্গে সংস্থাটির স্টোরের সংখ্যাও দ্রুত বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, বর্তমানে রাজ্যে ১১০টি কেন্দ্র থাকলেও আগামী দিনে তা বাড়িয়ে ২৫০ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন সংস্থার কর্তারা। ফলে রাজ্যে সরাসরি এবং পরোক্ষ—দুই ক্ষেত্রেই নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
সংস্থার তিন বছরের লক্ষ্যমাত্রা আরও দ্রুত পূরণের জন্য কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করেছেন বলেও জানান শুভেন্দু। তাঁর বক্তব্য, আগামী ১৮ মাসের মধ্যেই পশ্চিমবঙ্গে প্রস্তাবিত ১৪০টি নতুন স্টোর চালুর চেষ্টা করা হোক।
পুরুলিয়ার সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়েও বিস্তারিত তথ্য দেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, সেখানে ইতিমধ্যেই সংস্থার তরফে প্রায় ১০০ একর জমি সরাসরি কেনা হয়েছে। সেই জমিতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পের ভূমিপুজোয় তিনি নিজে উপস্থিত থাকবেন বলেও জানান। পরবর্তীতে সব মিলিয়ে প্রায় ১ হাজার একর জমি কেনার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
এর পাশাপাশি গত চার মাসে রাজ্যে বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠীর বিনিয়োগের খতিয়ানও তুলে ধরেন শুভেন্দু। তাঁর দাবি, ডানকুনিতে শ্রীরাম ও লাক্স গোষ্ঠীর প্রকল্পে প্রায় ৭০০ কোটি টাকার সম্প্রসারণ হচ্ছে। মেজিয়ায় শ্যাম স্টিলের প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার মেগা সম্প্রসারণ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। ওই সংস্থার তৈরি রোবট ফায়ার ভেহিকলের অর্ডার উত্তরপ্রদেশ-সহ অন্য রাজ্য থেকেও আসছে বলে জানান তিনি।
আমূলের সাঁকরাইল প্রকল্পের কথাও উল্লেখ করেন মুখ্যমন্ত্রী। সেখানে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ডেয়ারি ও মিষ্টি-দইয়ের কারখানার কাজ শুরু হয়েছে বলে দাবি তাঁর। উত্তর ও দক্ষিণ বাংলায় আরও দু’টি আইসক্রিম কারখানার জন্য জমি চিহ্নিত করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
রঘুনাথপুরে অমিত মেটালিক্সের নতুন প্রকল্পের ভূমিপুজো হয়েছে বলে জানান শুভেন্দু। তাঁর দাবি, ইউকো ব্যাঙ্ক প্রায় ১,৫০০ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন করার পর প্রকল্পের কাজ দ্রুত এগোচ্ছে। নিউটাউনে এল অ্যান্ড টি-র ৭ লক্ষ ৪৫ হাজার বর্গফুটের ডেটা সেন্টারের কাজও সম্পন্ন হয়েছে বলে জানান তিনি।
হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালসের সম্প্রসারণ প্রকল্পের কথাও তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকার নতুন প্ল্যান্ট দুর্গাপুজোর আগেই উদ্বোধন হওয়ার কথা রয়েছে বলে জানান তিনি। সংস্থার চেয়ারম্যান পূর্ণেন্দু চট্টোপাধ্যায়ের আমন্ত্রণে সেই অনুষ্ঠানে তাঁর উপস্থিত থাকার কথাও জানিয়েছেন।

প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রেও বাংলায় একাধিক প্রকল্প আসছে বলে দাবি শুভেন্দুর। তাঁর বক্তব্য, জিআরএসই-তে প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের উপস্থিতিতে চারটি প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। পাশাপাশি পূর্ব মেদিনীপুরের জুনপুট উপকূলে ডিআরডিও-র একটি বড় প্রতিরক্ষা প্রকল্পের জন্য রাজ্য সরকার প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র দিয়েছে বলেও জানান তিনি।
আদানি ও আম্বানী গোষ্ঠীর সঙ্গে রাজ্যের শিল্প যোগাযোগ নিয়েও বার্তা দেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর গৌতম আদানি কলকাতায় এসে নিউটাউনে ২ হাজার শয্যার হাসপাতালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন। অন্যদিকে অনন্ত আম্বানীর সঙ্গে টেলিফোনে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি। গণপতি উৎসবের পর মুম্বাই গিয়ে মুকেশ আম্বানী ও অনন্ত আম্বানীর সঙ্গে বৈঠকের পরিকল্পনাও রয়েছে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
তাজপুর গভীর সমুদ্র বন্দর প্রকল্পের ক্ষেত্রেও নতুন জায়গার কথা জানান শুভেন্দু। তাঁর দাবি, সরকারি খাসজমির অভাবের কারণে প্রকল্পটি নিকটবর্তী দাদন পাত্রবাড়ে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সেখানে রাজ্য সরকারের নিজস্ব প্রায় ১,৭০০ একর জমি রয়েছে বলে জানান তিনি।
শিল্প সংস্থাগুলিকে জমি হস্তান্তর নিয়েও বড় কর্মসূচির কথা ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, রাজ্য মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর পুজোর আগেই বিশেষ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ৩৩টি শিল্প সংস্থাকে দীর্ঘদিনের বকেয়া জমি আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে দেওয়া হবে।
শিল্প সংস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রেও সরকার কড়া অবস্থান নিচ্ছে বলে দাবি শুভেন্দুর। তাঁর বক্তব্য, শুধুমাত্র ছবি তোলা বা বড় ঘোষণা করার জন্য বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনা করা হচ্ছে না। কোনও সংস্থা আদৌ বিশ্বাসযোগ্য কি না, তাদের অর্থের উৎস স্বচ্ছ কি না এবং দুর্নীতির অর্থের সঙ্গে কোনও যোগ রয়েছে কি না—সবদিক খতিয়ে দেখেই বিনিয়োগের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে।
এদিনের অনুষ্ঠানে বিশ্বের বৃহত্তম ফ্যাশন ওয়ার্ডরোবের উদ্বোধন এবং গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডের স্বীকৃতিকেও বাংলার জন্য গর্বের মুহূর্ত বলে উল্লেখ করেন মুখ্যমন্ত্রী। একইসঙ্গে শিল্প, কর্মসংস্থান এবং পরিকাঠামো ক্ষেত্রে একাধিক প্রকল্পের তালিকা তুলে ধরে তাঁর দাবি, সরকার বদলের পর বাংলার শিল্পচিত্রে পরিবর্তন শুরু হয়েছে।
এদিন দিল্লিতে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের সান্ধ্যভোজে যোগ দেওয়ার বিষয়েও মুখ খোলেন শুভেন্দু। তিনি জানান, দেশের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক আয়োজন এবং সমস্ত মুখ্যমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। সেই আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে তিনি শনিবার দিল্লির অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন বলেও জানান।
