কলকাতা — রাজ্যে আনুষ্ঠানিক ভাবে চালু হল কেন্দ্রীয় সরকারের আয়ুষ্মান ভারত স্বাস্থ্যবিমা প্রকল্প। এই প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১ কোটি ৪৩ লক্ষ পরিবার, অর্থাৎ প্রায় ৬ কোটি রাজ্যবাসী চিকিৎসার সুবিধা পাবেন বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। মোট ১,৯৫০ ধরনের রোগের চিকিৎসা এই প্রকল্পের আওতায় থাকবে। এর মধ্যে হাঁটু প্রতিস্থাপনের মতো ব্যয়বহুল চিকিৎসাও রয়েছে। পাশাপাশি যাঁরা আয়ুষ্মান ভারতের আওতায় থাকবেন না, তাঁদের জন্য রাজ্য সরকার চালু করেছে মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্যবিমা যোজনা
রবিবার নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে আয়োজিত অনুষ্ঠানে দুই স্বাস্থ্যবিমা প্রকল্পের সূচনা হয়। অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়ের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী অনুপ্রিয়া পটেল। রাজ্য সরকারের দাবি, নতুন দুই প্রকল্পের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষের চিকিৎসার খরচের বোঝা অনেকটাই কমবে।

আয়ুষ্মান ভারতের আওতায় সারা দেশের ৩৮,৬০৪টি হাসপাতালে চিকিৎসা পরিষেবা নেওয়া যাবে। ফলে পশ্চিমবঙ্গের কোনও উপভোক্তা প্রয়োজনে অন্য রাজ্যে গিয়েও এই প্রকল্পের সুবিধা নিতে পারবেন। একই ভাবে অন্য রাজ্যের উপভোক্তারাও পশ্চিমবঙ্গের তালিকাভুক্ত হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে পারবেন। চিকিৎসা পরিষেবাকে রাজ্যের সীমানার বাইরে নিয়ে যাওয়ার এই সুবিধা রোগীদের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
এই প্রকল্পের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হাঁটু প্রতিস্থাপন। দীর্ঘদিন ধরেই হাঁটুর গুরুতর সমস্যায় ভোগা রোগীদের জন্য এই অস্ত্রোপচারের খরচ বড় চিন্তার বিষয়। নতুন দুই স্বাস্থ্যবিমা প্রকল্পে এই চিকিৎসা অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় আর্থিক ভাবে পিছিয়ে থাকা বহু পরিবার উপকৃত হতে পারে। মুখ্যমন্ত্রী নিজেই অনুষ্ঠানে এই সুবিধার কথা ঘোষণা করেন।
এর আগে রাজ্যের স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পেও হাঁটু প্রতিস্থাপনের সুবিধা ছিল। কিন্তু সেই পরিষেবা নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পরে তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। অভিযোগ ছিল, সরকারি হাসপাতালের কয়েক জন চিকিৎসক হাসপাতালের বদলে বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রে অস্ত্রোপচার করছিলেন। অস্ত্রোপচারের বিল নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। এর পর বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু হয় এবং হাঁটু প্রতিস্থাপনের সুবিধা বন্ধ হয়ে যায়। পরে নির্দিষ্ট শর্তে পরিষেবা ফের চালু হলেও তা নিয়ে নানা বিধিনিষেধ ছিল। এ বার আয়ুষ্মান ভারত এবং মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্যবিমা যোজনায় এই সুবিধা ফের বিস্তৃত ভাবে চালু হচ্ছে।
মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, আগের স্বাস্থ্যবিমা ব্যবস্থায় প্রায় ১,৭০০ ধরনের রোগের চিকিৎসা পাওয়া যেত। নতুন ব্যবস্থায় সেই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১,৯৫০। ফলে রোগের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি চিকিৎসার পরিধিও বিস্তৃত হচ্ছে। বিশেষ করে গুরুতর এবং ব্যয়বহুল চিকিৎসার ক্ষেত্রে এই সুবিধা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

শুধু আয়ুষ্মান ভারত নয়, যাঁরা কেন্দ্রীয় প্রকল্পের আওতায় পড়ছেন না, তাঁদের জন্য মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্যবিমা যোজনাও চালু করেছে রাজ্য সরকার। প্রায় ৮০ লক্ষ রাজ্যবাসী এই প্রকল্পের সুবিধা পাবেন বলে জানানো হয়েছে। ফলে কেন্দ্র ও রাজ্যের দুই প্রকল্প মিলিয়ে আরও বেশি মানুষকে স্বাস্থ্যবিমার আওতায় আনার চেষ্টা করছে সরকার।
৭০ বছর বা তার বেশি বয়সি প্রত্যেক রাজ্যবাসী আয়ুষ্মান ভারতের সুবিধা পাবেন বলেও অনুষ্ঠানে জানানো হয়েছে। বয়স্ক মানুষের চিকিৎসার ক্ষেত্রে এই ঘোষণা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হৃদ্রোগ, হাড়ের সমস্যা, অস্ত্রোপচার এবং বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি রোগের চিকিৎসার প্রয়োজন বাড়ে। ফলে বয়স্কদের জন্য সরকারি স্বাস্থ্যবিমার পরিধি বাড়লে পরিবারের চিকিৎসা খরচও কমতে পারে।
রাজ্যের স্বাস্থ্য কমিশনের সদস্য চিকিৎসক নারায়ণ বন্দ্যোপাধ্যায় এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁর মতে, আর্থিক ভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষেরা এই প্রকল্পের মাধ্যমে বিশেষ ভাবে উপকৃত হবেন। তাঁর বক্তব্য, পশ্চিমবঙ্গে এই প্রকল্প অনেক আগেই চালু হওয়া উচিত ছিল। এখন তা চালু হওয়ায় দরিদ্র মানুষের চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ বাড়বে।
২০১৮ সালে নরেন্দ্র মোদী সরকারের আমলে দেশে আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্প চালু হয়েছিল। এত দিন পশ্চিমবঙ্গে তা কার্যকর হয়নি। রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পরে কেন্দ্রের এই প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বেসরকারি হাসপাতাল ও নার্সিংহোমগুলির সংগঠনও এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে।
সংগঠনের সম্পাদক রাজীব পাণ্ডের বক্তব্য, প্রায় ১,৯৫০টি চিকিৎসা প্যাকেজের আওতায় রোগীদের পরিষেবা দেওয়া সম্ভব হবে। এর ফলে পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দারা যেমন অন্য রাজ্যে গিয়ে চিকিৎসা করাতে পারবেন, তেমনই অন্য রাজ্যের রোগীরাও পশ্চিমবঙ্গে চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ পাবেন। এতে রাজ্যের চিকিৎসা পরিকাঠামো ব্যবহার করে আরও বেশি মানুষ উপকৃত হতে পারেন।
স্বাস্থ্যবিমার পাশাপাশি কম দামে ওষুধ এবং চিকিৎসার সরঞ্জাম দেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এ জন্য হিন্দুস্তান লাইফ কেয়ার লিমিটেডের সঙ্গে রাজ্য সরকারের একটি সমঝোতাপত্র স্বাক্ষর হয়েছে। এর মাধ্যমে রাজ্যের ১০০টি সরকারি হাসপাতালে অমৃত ফার্মাসি চালু করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।অমৃত

ফার্মাসি থেকে বিভিন্ন ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী ৫০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কম দামে পাওয়া যাবে বলে জানানো হয়েছে। ক্যানসার ও হৃদ্রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত বিভিন্ন ব্র্যান্ডেড এবং জেনেরিক ওষুধও সেখানে পাওয়া যাবে। স্টেন্ট এবং পেসমেকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা সরঞ্জামও তুলনামূলক কম দামে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী অনুপ্রিয়া পটেল জানিয়েছেন, দেশের বেশ কয়েকটি রাজ্যে ইতিমধ্যে অমৃত ফার্মাসি চালু হয়েছে। এ বার পশ্চিমবঙ্গেও সেই পরিষেবা চালু হতে চলেছে। ফলে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের ওষুধ কেনার খরচ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
চিকিৎসক নারায়ণ বন্দ্যোপাধ্যায় অমৃত ফার্মাসির সিদ্ধান্তকেও স্বাগত জানিয়েছেন। তবে ওষুধের মান এবং পরিষেবার ধারাবাহিকতা কেমন থাকে, তা বাস্তবে চালু হওয়ার পরেই বোঝা যাবে বলে মনে করেন তিনি। বেসরকারি হাসপাতাল সংগঠনের সম্পাদক রাজীব পাণ্ডেরও আশা, ওষুধের মানের সঙ্গে কোনও আপস করা হবে না।
সব মিলিয়ে রাজ্যে একসঙ্গে কেন্দ্র ও রাজ্যের দুই স্বাস্থ্যবিমা প্রকল্প চালু হওয়ায় চিকিৎসা পরিষেবার ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে হাঁটু প্রতিস্থাপন, ক্যানসার, হৃদ্রোগের মতো ব্যয়বহুল চিকিৎসা এবং বয়স্কদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে এই প্রকল্প কতটা কার্যকর হয়, সেটাই এখন দেখার। একই সঙ্গে কম দামে ওষুধ পাওয়ার ব্যবস্থা চালু হলে চিকিৎসার সামগ্রিক খরচও সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আসতে পারে।
