30 C
Kolkata
August 16, 2026
রাজ্য

আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু ঘিরে প্রশ্ন, আত্মহত্যা না খুন খতিয়ে দেখার দাবি

রামপুরহাট — রামপুরহাটের প্রাক্তন বিধায়ক আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু ঘিরে রহস্য আরও ঘনীভূত হয়েছে। বাড়ি লাগোয়া দলীয় কার্যালয় থেকে তাঁর ঝুলন্ত দেহ উদ্ধারের পর প্রাথমিক ভাবে আত্মহত্যার সন্দেহ করা হলেও, ঘটনাটি নিছক আত্মহত্যা কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। রাজ্যের মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল জানিয়েছেন, আশিস নিজেই আত্মহত্যা করেছেন কি না, নাকি তাঁকে খুন করা হয়েছে, তদন্তে দুই সম্ভাবনাই খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তাঁর সঙ্গে পাওয়া এক পাতার সুইসাইড নোটও পরীক্ষা করে দেখার কথা বলেছেন তিনি।

রবিবার সকালে আশিসের দেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তিনি রামপুরহাটের পাঁচ বারের বিধায়ক ছিলেন। গত বিধানসভা নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পর দলের অন্দরে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান বদলেছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করে তিনি ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়দের শিবিরে যোগ দিয়েছিলেন বলে জানা গিয়েছে।

দেহের সঙ্গে পাওয়া এক পাতার চিঠিতে আশিস লিখে গিয়েছেন, তাঁর মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নন। নিজের রাজনৈতিক জীবন নিয়েও সেখানে নানা কথা লিখেছেন তিনি। কোনও দিন দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না এবং তাঁকে কালিমালিপ্ত করার চেষ্টা চলছিল বলেও চিঠিতে উল্লেখ রয়েছে বলে জানা গিয়েছে। সেই চিঠির বিষয়বস্তু সামনে আসার পরই তাঁর মৃত্যু ঘিরে রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছে।

অগ্নিমিত্রা পাল এই ঘটনায় দ্রুত কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছতে নারাজ। তাঁর বক্তব্য, সঙ্গে সুইসাইড নোট পাওয়া গিয়েছে বলেই ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। দেহ উদ্ধারের পরিস্থিতি, চিঠির সত্যতা এবং মৃত্যুর আগে কী ঘটেছিল, সব দিক খতিয়ে দেখা দরকার। তাঁর মতে, আশিসকে খুন করা হয়েছিল কি না, সেই সম্ভাবনাও তদন্তকারীদের যাচাই করতে হবে।

আশিসের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষেরাও অবশ্য তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগকে সত্য বলে মানতে রাজি নন। অগ্নিমিত্রার বক্তব্যেও সেই সুর শোনা যায়। তিনি বলেন, তৃণমূলের প্রত্যেক নেতা দুর্নীতিতে যুক্ত, এমনটা বলা ঠিক নয়। তাঁর মতে, ওই দলের মধ্যেও এমন কিছু নেতা ছিলেন, যাঁরা সৎ ভাবে রাজনীতি করেছেন এবং নিজের নীতি মেনে চলেছেন।অন্য দিকে, আশিসের মৃত্যু নিয়ে সরাসরি|

আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ তুলেছেন তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষ। তাঁর দাবি, আশিসকে মানসিক ভাবে চাপ দেওয়া হচ্ছিল এবং রাজনৈতিক ভাবে হেনস্থা করা হয়েছিল। এই অভিযোগের পক্ষে একটি ভিডিয়োও সমাজমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন তিনি। ভিডিয়োটির সত্যতা স্বাধীন ভাবে যাচাই করা হয়নি।

কুণালের প্রকাশ করা ভিডিয়োয় এক যুবককে গাড়ির ভিতরে আশিসের সঙ্গে উত্তপ্ত ভাবে কথা বলতে দেখা যায়। তাঁকে আশিসের উদ্দেশে হুমকিসূচক ভাষা ব্যবহার করতেও শোনা যায়। কুণালের দাবি, ভিডিয়োয় থাকা ওই ব্যক্তি বিজেপির সঙ্গে যুক্ত। তাঁর বিরুদ্ধে আশিসকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি।

তবে ভিডিয়োয় দেখা ব্যক্তির পরিচয় বা ঘটনার প্রেক্ষাপট নিয়ে স্বাধীন ভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তাই এই অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমেই পরিষ্কার হবে। আশিসের মৃত্যুর আগে তাঁর সঙ্গে কার কার যোগাযোগ হয়েছিল, কোথায় গিয়েছিলেন এবং তাঁর উপর কোনও ধরনের চাপ ছিল কি না, সেই সব প্রশ্নও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বীরভূমের তৃণমূল নেতা অনুব্রত মণ্ডলও শক্তিগড়ে আশিসের সঙ্গে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার প্রসঙ্গ তুলেছেন। তাঁর দাবি, সেখানে আশিসের সঙ্গে অন্যায় করা হয়েছিল। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে তাঁর কথা হয়েছিল বলেও জানিয়েছেন তিনি। অনুব্রতের বক্তব্য অনুযায়ী, মুখ্যমন্ত্রী আশিসকে থানায় অভিযোগ করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তবে তিনি কেন অভিযোগ করেননি, তা তাঁর জানা নেই বলে জানিয়েছেন অনুব্রত।

আশিসের রাজনৈতিক অবস্থান বদল নিয়েও নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। কুণাল ঘোষের দাবি, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়দের শিবিরে যোগ দেওয়ার জন্য আশিসের উপর চাপ তৈরি করা হয়েছিল। এমনকি তিনি ওই শিবিরে যাওয়ার বিষয়ে দলের কয়েক জন নেতার কাছে নিজের আপত্তির কথাও জানিয়েছিলেন বলে দাবি কুণালের। তবে এই অভিযোগের স্বাধীন সমর্থন এখনও সামনে আসেনি।

অন্য দিকে, আশিসের মৃত্যুর খবর পেয়ে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়দের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল রামপুরহাটের উদ্দেশে রওনা হয়েছে। সেই দলে ঋতব্রত ছাড়াও আখরুজ্জামান, স্নেহাশিস চক্রবর্তী, নরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী এবং ঋজু দত্ত রয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। জেলার নেতারাও ইতিমধ্যে ঘটনাস্থলে পৌঁছেছেন।

ঋতব্রত আশিসের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, আশিস ছিলেন সর্বজনশ্রদ্ধেয় নেতা। তাঁর সঙ্গে পাওয়া চিঠি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। সরকার বদলের পরে সামনে আসা বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে আশিসও মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েছিলেন বলে দাবি করেছেন ঋতব্রত। একই সঙ্গে গত কয়েক বছরে রাজ্যে সংগঠিত দুর্নীতি ও অপরাধের অভিযোগ তুলে রাজনৈতিক আক্রমণও করেছেন তিনি।


আশিসের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও। তিনি আশিসকে শিক্ষক এবং জনসেবক হিসেবে উল্লেখ করে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের প্রশংসা করেছেন। তাঁর বক্তব্য, আশিসের লেখা চিঠিতে অপপ্রচার ও তাঁকে কালিমালিপ্ত করার যন্ত্রণার কথা উঠে এসেছে। রাজনৈতিক বিরোধ থাকলেও কোনও মানুষের জীবন চলে গেলে তার মূল্য ফেরানো সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু কি সত্যিই আত্মহত্যা, নাকি এর পিছনে অন্য কোনও কারণ রয়েছে। তাঁর লেখা চিঠি কতটা স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে লেখা হয়েছিল, মৃত্যুর আগে তিনি কার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন এবং তাঁকে কোনও ভাবে হেনস্থা বা চাপ দেওয়া হয়েছিল কি না, সবই তদন্তের আওতায় আসতে পারে।

পুলিশের নিরপেক্ষ তদন্তেই এই প্রশ্নগুলির উত্তর মিলবে। বিশেষ করে সুইসাইড নোট, ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এবং আশিসের শেষ কয়েক ঘণ্টার গতিবিধি খতিয়ে দেখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক চাপানউতোরের বাইরে গিয়ে তদন্ত কতটা নিরপেক্ষ ভাবে এগোয়, এখন সেদিকেই নজর থাকবে।

Related posts

Leave a Comment