পুলিশি হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনায় মৃত তৃণমূলকর্মীর স্ত্রীকে চাকরি, ১০ লক্ষ টাকা সাহায্যও
সংবাদ কলকাতা: উত্তর ২৪ পরগনার হালিশহরে পুলিশি হেফাজতে তৃণমূলকর্মী বিরজু কেওটের মৃত্যুর ঘটনায় কড়া প্রশাসনিক পদক্ষেপের ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী তথা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সোমবার নিহতের পরিবারের সঙ্গে দেখা করার পর তিনি জানান, ঘটনার তদন্তকারী আধিকারিককে সাসপেন্ড করা হচ্ছে এবং হালিশহর থানার আইসিকে ক্লোজ করে পুলিশ লাইনে পাঠানো হচ্ছে। পাশাপাশি, ম্যাজিস্ট্রেট পর্যায়ের তদন্তের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
হালিশহরে নিহতের বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী। পরে সংবাদমাধ্যমের সামনে তিনি বলেন, পুলিশি হেফাজতে মৃত্যুর মতো সংবেদনশীল ঘটনায় সরকার কোনও ধরনের গাফিলতি বরদাস্ত করবে না। তাই ঘটনার প্রকৃত সত্য সামনে আনতেই দ্রুত তদন্ত শুরু করা হয়েছে।

মুখ্যমন্ত্রী জানান, নিয়ম অনুযায়ী ম্যাজিস্ট্রেট পর্যায়ের তদন্ত হবে। উত্তর ২৪ পরগনার জেলাশাসক শিল্পী গৌরীসারিয়াকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্তের অগ্রগতি নিয়মিতভাবে সরকার এবং মৃতের পরিবারকে জানানো হবে বলেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিয়েছে রাজ্য সরকার। শুভেন্দু ঘোষণা করেন, নিহতের স্ত্রীকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অ্যাটেনডেন্ট হিসেবে নিয়োগ করা হবে। প্রথম এক বছর প্রতি মাসে ১৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। এরপর তাঁকে গ্রুপ-ডি পদে স্থায়ী চাকরি দেওয়া হবে। পাশাপাশি পরিবারের দুই সন্তানের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে ১০ লক্ষ টাকার আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘পরিবার কোনও আর্থিক সাহায্যের দাবি করেনি। কিন্তু বাড়িতে দুই ছোট সন্তান রয়েছে। তাদের পড়াশোনা ও ভবিষ্যতের কথা ভেবেই সরকার এই সাহায্যের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’
এ দিন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কটাক্ষ করতেও ছাড়েননি শুভেন্দু। তিনি বলেন, ‘আপনি পুলিশকে না জানিয়ে গিয়েছিলেন। আমাদের বিধায়ক খবর পাওয়ার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করেছেন। ভবিষ্যতে কোথাও গেলে পুলিশকে আগে থেকে জানিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করব।’

একই সঙ্গে শুভেন্দুর দাবি, গত কয়েক বছরে বহু বিজেপি কর্মী রাজনৈতিক হিংসার শিকার হলেও তাঁদের পরিবারের পাশে তৎকালীন সরকার দাঁড়ায়নি। অথচ বর্তমান সরকার রাজনৈতিক পরিচয় না দেখে নিহত তৃণমূলকর্মীর পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী আরও জানান, নিহতের স্ত্রী তাঁর হাতে একটি লিখিত অভিযোগপত্র দিয়েছেন। সেখানে স্বামীর উপর শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ করা হয়েছে। তবে ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট হাতে পাওয়ার আগে মৃত্যুর কারণ নিয়ে কোনও চূড়ান্ত মন্তব্য করতে চাননি তিনি। তদন্তে যাঁদের বিরুদ্ধে প্রমাণ মিলবে, তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও আশ্বাস দেন।
প্রসঙ্গত, কাঁচরাপাড়া পুরসভার প্রাক্তন কাউন্সিলর জেনি শর্মা কেওটের স্বামী বিরজু কেওটকে তোলাবাজি-সহ একাধিক অভিযোগে গ্রেপ্তার করেছিল হালিশহর থানার পুলিশ। আদালত তাঁকে পাঁচ দিনের পুলিশি হেফাজতে পাঠায়। কিন্তু তার মধ্যেই তাঁর মৃত্যুর খবর সামনে আসে। পরিবারের অভিযোগ, পুলিশি নির্যাতনের ফলেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে।

ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলেও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। রবিবার নিহতের পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে বিক্ষোভের মুখে পড়েন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই ঘটনার পর থেকেই রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে এই ইস্যু নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে।
তবে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, পরিবার সরকারের উপর আস্থা রেখেছে এবং মৃত্যুকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার সুযোগ দেয়নি। তিনি বলেন, ‘পরিবারের সদস্যরা শুধু সুবিচার চেয়েছেন। প্রশাসনের উপর তাঁদের এই আস্থা আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
