29 C
Kolkata
August 23, 2026
বিদেশ

প্রামবানান মন্দিরে ভারতের সংরক্ষণ প্রকল্পের সূচনা, ইন্দোনেশিয়ায় ঐতিহাসিক সফরে প্রধানমন্ত্রী মোদী

ইন্দোনেশিয়ার যোগ্যাকার্তায় অবস্থিত প্রায় এক হাজার বছরের প্রাচীন প্রামবানান (Prambanan) মন্দির সংরক্ষণের জন্য ভারতের সহায়তায় একটি বড় প্রকল্পের সূচনা করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। শনিবার ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোর সঙ্গে প্রামবানান মন্দির চত্বরে উপস্থিত থেকে তিনি এই প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। দুই দিনের ইন্দোনেশিয়া সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি ছিল এই অনুষ্ঠান।

এর আগে জাকার্তায় যৌথ সাংবাদিক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী মোদী বলেছিলেন, প্রামবানান মন্দির ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ও সভ্যতার সম্পর্কের এক অনন্য নিদর্শন। সেই ঐতিহ্য রক্ষায় দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করবে।

কেন এই প্রকল্পে ভারতের অংশগ্রহণ?
ভারতের রাষ্ট্রদূত সন্দীপ চক্রবর্তী জানান, ২০২৫ সালের ভারত-ইন্দোনেশিয়া যৌথ ঘোষণাপত্র অনুযায়ী প্রামবানান মন্দির সংরক্ষণে ভারত সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন হিসেবেই এই প্রকল্প শুরু হয়েছে।

এই প্রকল্পে ভারতের আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া (ASI), ইন্দোনেশিয়ার সংস্কৃতি মন্ত্রক এবং ইন্দোনেশিয়ান হেরিটেজ এজেন্সি যৌথভাবে কাজ করছে। ইতিমধ্যেই এএসআই-এর বিশেষজ্ঞ দল মন্দির পরিদর্শন করে সংরক্ষণ সংক্রান্ত একটি বিস্তারিত প্রকল্প রিপোর্ট তৈরি করেছে।

ইন্দোনেশিয়ার সংস্কৃতিমন্ত্রী ফাদলি জোন জানান, মূল তিনটি মন্দিরের চারপাশে থাকা ছোট ছোট ‘পেরওয়ারা’ মন্দিরগুলির সংরক্ষণ ও পুনর্গঠনের কাজ এই প্রকল্পের প্রধান লক্ষ্য।

বিদেশে ঐতিহ্য সংরক্ষণে ভারতের অভিজ্ঞতা
বিদেশে ঐতিহাসিক স্থাপত্য সংরক্ষণে ভারতের অভিজ্ঞতা নতুন নয়। এর আগে—

  • ২০১৪ সালে ভিয়েতনামের মাই সন স্যাংচুয়ারি পুনরুদ্ধার,
  • ২০২১ সালে বাংলাদেশের রমনা কালী মন্দির পুনর্নির্মাণ,
  • ২০২২ সালে কম্বোডিয়ার অঙ্কোর ওয়াটতা প্রহম মন্দিরে সংরক্ষণ কাজ,
  • ২০২৪ সালে লাওসের ভাট ফু (Vat Phou) মন্দির পুনরুদ্ধার—

সহ একাধিক আন্তর্জাতিক প্রকল্প সফলভাবে সম্পন্ন করেছে এএসআই।

প্রামবানান মন্দিরের ইতিহাস

প্রামবানান মন্দির নির্মাণ শুরু হয় আনুমানিক খ্রিস্টীয় ৮৫০ সালে। এটি নির্মাণ করেছিলেন সঞ্জয় বংশের রাজা রাকাই পিকাতান। ইতিহাসবিদদের মতে, জাভায় হিন্দু শাসনের পুনঃপ্রতিষ্ঠার স্মারক হিসেবেই এই মন্দির নির্মিত হয়েছিল।

পরবর্তীতে রাজা পিকাতান বৌদ্ধ শৈলেন্দ্র বংশের রাজকুমারী প্রমোধবর্ধনীকে বিয়ে করেন। এর ফলে একই রাজ্যে হিন্দু ও বৌদ্ধ—দুই ধর্মীয় ঐতিহ্যের সহাবস্থান গড়ে ওঠে।

স্থাপত্যের অনন্য বৈশিষ্ট্য

প্রামবানান কমপ্লেক্সটি মণ্ডল (Mandala) পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্মিত। তিনটি বর্গাকার স্তরে বিভক্ত এই কমপ্লেক্সের কেন্দ্রে রয়েছে আটটি প্রধান মন্দির।

সবচেয়ে উঁচু ৪৭ মিটার উচ্চতার মন্দিরটি উৎসর্গ করা হয়েছে ভগবান শিবকে। এছাড়া পৃথকভাবে বিষ্ণুব্রহ্মার জন্যও মন্দির রয়েছে।

স্থাপত্যে মেরু পর্বতের প্রতীকী ধারণা ব্যবহার করা হয়েছে। হিন্দু ধর্মবিশ্বাস অনুযায়ী মেরুই দেবতাদের আবাসস্থল। সেই ধারণাকেই প্রতিফলিত করে মন্দিরগুলির ক্রমোর্ধ্বমুখী শিখর।

দুর্গা মূর্তি ও ‘রোরো জংগ্রাং’ কিংবদন্তি

শিব মন্দিরের ভেতরে রয়েছে ভগবান শিবের বিশাল মূর্তি। পাশাপাশি দেবী দুর্গার একটি বিখ্যাত প্রতিমাও রয়েছে।

স্থানীয় লোককথা অনুযায়ী, এই দুর্গা মূর্তিই আসলে রাজকুমারী রোরো জংগ্রাং। কিংবদন্তি অনুসারে, রাজপুত্র বান্দুং বন্ডোভোসো এক রাতের মধ্যে এক হাজার মন্দির নির্মাণের শর্ত পূরণ করতে গিয়েও শেষ পর্যন্ত একটি মন্দির অসম্পূর্ণ রেখে ফেলেন। প্রতারণার অভিযোগে রাজকুমারীকে তিনি অভিশাপ দিয়ে পাথরে পরিণত করেন। সেই পাথরের মূর্তিকেই আজকের দুর্গা প্রতিমা বলে স্থানীয়দের বিশ্বাস।

এই কিংবদন্তির কারণেই প্রামবানান স্থানীয়ভাবে ‘চান্ডি রোরো জংগ্রাং’ নামেও পরিচিত।

পতন, পুনরাবিষ্কার ও পুনর্গঠন

দশম শতকে মাতারাম রাজবংশ রাজধানী পূর্ব জাভায় সরিয়ে নেওয়ার পর ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারায় প্রামবানান। ষোড়শ শতকের ভূমিকম্প এবং আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপে মন্দির ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

১৭৩৩ সালে ডাচ প্রশাসনিক কর্মকর্তা সি.এ. লন্স এই ধ্বংসাবশেষ পুনরায় আবিষ্কার করেন। এরপর বিংশ শতকের শুরু থেকে ডাচ প্রশাসনের উদ্যোগে সংরক্ষণ কাজ শুরু হয়।

২০০৬ সালের জাভা ভূমিকম্পেও মন্দিরের কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ইউনেস্কো স্বীকৃতি ও বর্তমান গুরুত্ব

১৯৯১ সালে ইউনেস্কো প্রামবানানকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের মর্যাদা দেয়। ১৯৯৮ সালে ইন্দোনেশিয়া সরকার এটিকে জাতীয় সাংস্কৃতিক সম্পত্তি হিসেবে ঘোষণা করে।

বর্তমানে এটি শুধু পর্যটন কেন্দ্রই নয়, হিন্দুদের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাসনাস্থলও। বিশেষ করে মহাশিবরাত্রি উপলক্ষে এখানে বিশেষ পূজার আয়োজন হয়।

প্রতি বছর মে থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত পূর্ণিমার রাতে মন্দির প্রাঙ্গণে উন্মুক্ত মঞ্চে বিখ্যাত রামায়ণ ব্যালে পরিবেশিত হয়, যা দেশ-বিদেশের পর্যটকদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।

Related posts

Leave a Comment