ওয়াশিংটন, ২৮ জুন: পশ্চিম এশিয়ায় সংঘর্ষবিরতির সম্ভাবনা তৈরি হলেও বাস্তবে উত্তেজনা আরও তীব্র হচ্ছে। হরমুজ প্রণালীর কাছে একটি বাণিজ্যিক তেলবাহী জাহাজে ড্রোন হামলার অভিযোগ তুলে ইরানের একাধিক সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে বড়সড় হামলা চালিয়েছে মার্কিন সেনাবাহিনী। তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পাল্টা কড়া বার্তা দিয়েছে তেহরান। ইরানের ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড জানিয়েছে, ভবিষ্যতে তাদের উপর যে কোনও হামলার ‘বিধ্বংসী জবাব’ দেওয়া হবে। ফলে নতুন করে যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে পশ্চিম এশিয়াজুড়ে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের দাবি, স্থানীয় সময় শনিবার ভোর সাড়ে চারটে নাগাদ পানামার পতাকাবাহী তেলবাহী জাহাজ ‘এম টি কিকু’-তে একমুখী হামলাকারী ড্রোন আঘাত হানে। ওই জাহাজে ২০ লক্ষেরও বেশি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ছিল। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক নৌপথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাওয়ার সময় এই হামলা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে ওয়াশিংটন। মার্কিন প্রশাসনের বক্তব্য, ইরানকে সংঘর্ষবিরতি মেনে চলার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা সেই সুযোগ গ্রহণ না করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্য করে নতুন হামলা চালিয়েছে।
এই ঘটনার পরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক অভিযান শুরু হয়। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে ইরানের নজরদারি কেন্দ্র, সামরিক যোগাযোগ ব্যবস্থা, আকাশ প্রতিরক্ষা ঘাঁটি, ড্রোন সংরক্ষণ কেন্দ্র এবং সমুদ্রে মাইন পাতা সংক্রান্ত সামরিক পরিকাঠামোয় নির্ভুল হামলা চালানো হয়েছে। একই সঙ্গে মার্কিন নৌবাহিনী এবং বায়ুসেনার যৌথ অভিযানে হরমুজ প্রণালী ও তার আশপাশে মোট ১০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করার দাবি করেছে ওয়াশিংটন।
মার্কিন প্রশাসনের বক্তব্য, এই অভিযানের উদ্দেশ্য যুদ্ধ ছড়িয়ে দেওয়া নয়, বরং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক জলপথে হামলার ঝুঁকি কমানোই এই অভিযানের মূল লক্ষ্য বলে দাবি করেছে তারা।
এর মধ্যেই সমাজমাধ্যমে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি লিখেছেন, ‘এমন একটা সময় আসতে চলেছে, যখন আমরা আর সংযত থাকতে পারব না। যে কাজটা আমরা শুরু করেছি, প্রয়োজন হলে তা সামরিক ভাবেই শেষ করতে হবে। যদি সেই পরিস্থিতি তৈরি হয়, তা হলে ইরানের অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে পড়বে।’
ট্রাম্পের এই মন্তব্য প্রকাশ্যে আসার পরই পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানায় ইরানের ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড। তাদের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ এবং চুক্তি লঙ্ঘন এই আগ্রাসী শক্তির স্বভাব। তারা আমাদের সামরিক পদক্ষেপকে অজুহাত করে ইরানের উপকূলবর্তী একাধিক ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। এখন থেকে যে কোনও আগ্রাসনের জবাব আরও কঠোর এবং বিধ্বংসী হবে। কোনও শত্রুকেই আর ছাড় দেওয়া হবে না।’
ইরানের দাবি, সংঘর্ষবিরতির শর্ত বারবার লঙ্ঘন করছে আমেরিকাই। দুই সপ্তাহ আগে উভয় দেশ ৬০ দিনের সংঘর্ষবিরতির লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারকে সম্মত হয়েছিল। কিন্তু সেই সমঝোতা বাস্তবায়নের আগেই বারবার সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ তেহরানের। ইরানের সেনাবাহিনীর বক্তব্য, সংঘর্ষবিরতি ভাঙার অর্থ শুধু একটি চুক্তি লঙ্ঘন নয়, গোটা শান্তি প্রক্রিয়াকেই বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া।
এরই মধ্যে ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছেন, আগামী ৩০ দিন হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা এবং নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতেই থাকবে। ইরাক সফরে গিয়ে তিনি বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলিকে নিয়ে একটি যৌথ নিরাপত্তা কাঠামো গঠনের কাজ চলছে। তবে সেই প্রক্রিয়ায় বাইরের কোনও শক্তির হস্তক্ষেপ গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁর বক্তব্য, হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব আঞ্চলিক দেশগুলিরই এবং সেই দায়িত্ব ইরান পালন করবে।
মার্কিন হামলার পর ইরানের নৌ ও বায়ুসেনা যৌথভাবে পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট কয়েকটি লক্ষ্যবস্তুর দিকে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার দাবি করেছে। কুয়েত ও বাহরিনের প্রতিরক্ষা বাহিনী জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়েছে এবং কয়েকটি আকাশপথে আসা লক্ষ্যবস্তুকে প্রতিহত করার চেষ্টা চলছে। তবে এই ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনও প্রকাশ করা হয়নি।
এর আগে ওমান উপকূলের কাছে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করেই নতুন করে উত্তেজনা শুরু হয়েছিল। সেই ঘটনার জন্য আমেরিকা ইরানকে দায়ী করলেও তেহরান অভিযোগ অস্বীকার করে উল্টে মার্কিন বাহিনীর দিকেই আঙুল তোলে। এরপর হরমুজ প্রণালীতে পানামার পতাকাবাহী তেলবাহী জাহাজে হামলার অভিযোগ ঘিরে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
তবে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, বর্তমান উত্তেজনার মধ্যেও হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল অব্যাহত রয়েছে। আন্তর্জাতিক জলপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মার্কিন নৌবাহিনী এবং মিত্র দেশগুলির বাহিনী সার্বক্ষণিক নজরদারি চালাচ্ছে।
বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের একটি বড় অংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে যায়। ফলে এই অঞ্চলে সামরিক সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়ার পাশাপাশি বিশ্ব অর্থনীতিতেও তার বড় প্রভাব পড়তে পারে। সেই কারণেই পশ্চিম এশিয়ার এই নতুন সংঘাত আন্তর্জাতিক মহলেও গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
