সংবাদ কলকাতা: গত দেড় দশকে রাজ্য সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে চুক্তিভিত্তিক কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখতে উদ্যোগী হল মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সরকার। বিশেষ করে চুক্তিভিত্তিক গ্রুপ ডি কর্মীদের নিয়োগে সরকারি নিয়ম ও অর্থ দপ্তরের নির্দেশিকা মানা হয়েছিল কি না, তা যাচাই করা হবে। এ জন্য রাজ্যের সমস্ত দপ্তরের কাছে কর্মীদের বিস্তারিত তথ্য ও নিয়োগ সংক্রান্ত নথি চেয়ে পাঠিয়েছে নবান্ন। আগামী ৬ নভেম্বরের মধ্যে নির্দিষ্ট ছকে সেই তথ্য জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে, সেচ ও জলসম্পদ দপ্তর ইতিমধ্যেই রাজ্যের সমস্ত সার্কেলের সুপারিনটেন্ডিং ইঞ্জিনিয়ারদের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে। সেখানে চুক্তিভিত্তিক গ্রুপ ডি কর্মীদের নিয়োগ সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে। নিয়োগের ক্ষেত্রে অর্থ দপ্তরের নির্দেশিকা অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, সংশ্লিষ্ট কর্মীদের বিরুদ্ধে কোনও ফৌজদারি মামলা বা অসদাচরণের অভিযোগ রয়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে। প্রয়োজনীয় নথি-সহ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিপোর্ট জমা দিতে হবে।
প্রশাসনের এই উদ্যোগের কেন্দ্রে রয়েছে বিগত দেড় দশকে চুক্তিভিত্তিক কর্মী নিয়োগের পরিসর ও পদ্ধতি। অভিযোগ, স্থায়ী পদে নিয়মিত নিয়োগের পরিবর্তে বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও সংস্থায় বিপুল সংখ্যক অস্থায়ী ও চুক্তিভিত্তিক কর্মী নিয়োগ করা হয়েছিল। বিরোধীদের একাংশের দাবি ছিল, অনেক ক্ষেত্রে স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠদের বিভিন্ন দপ্তরে কাজের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে এই অভিযোগগুলির সত্যতা এখনও যাচাই হয়নি। নতুন সরকারের উদ্যোগে নিয়োগের নথি পরীক্ষা করে সেই বিষয়গুলিই খতিয়ে দেখা হবে।
বিভিন্ন সময়ে রাজ্যে চুক্তিভিত্তিক কর্মীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়েছে বলে সরকারি ও প্রকাশিত পরিসংখ্যানে দাবি করা হয়েছে। ২০১২ সালে দমকল বিভাগে একসঙ্গে ১,৬৯২ জন চুক্তিভিত্তিক কর্মী নিয়োগের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। ২০১৩ সালে পুলিশি সহায়তার জন্য ১ লক্ষ ৩০ হাজার সিভিক পুলিশ নিয়োগের অনুমোদনও আসে। পরবর্তী সময়ে সিভিক ভলান্টিয়ার, গ্রাম পুলিশ ও গ্রিন পুলিশের সংখ্যা বাড়ে। ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, এই তিন শ্রেণিতে কর্মীর সংখ্যা ১ লক্ষ ১৫ হাজারের বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি ওই বছরের রাজ্য বাজেটে চুক্তিভিত্তিক গ্রুপ সি ও গ্রুপ ডি কর্মীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৫০ হাজার।
চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের নিয়োগ ও চাকরির ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে কর্মচারী সংগঠনগুলি। অল বেঙ্গল কনট্র্যাকচুয়াল এমপ্লয়িজ অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান উপদেষ্টা মনোজ চক্রবর্তীর বক্তব্য, বছরের পর বছর চুক্তিভিত্তিক কর্মীর সংখ্যা বেড়েছে, অথচ বহু স্থায়ী পদ খালি পড়ে রয়েছে। তাঁর মতে, এই ধরনের নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে যোগ্য চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের স্থায়ী পদে নিয়োগ এবং যোগ্যতা অনুযায়ী গ্রুপ ডি থেকে গ্রুপ সি পদে উন্নীত করার দাবিও জানিয়েছেন তিনি।

তাঁর বক্তব্য, দীর্ঘদিন চুক্তিভিত্তিক কাজে যুক্ত থাকার পরেও বহু কর্মীর অবসরকালীন সুবিধা বা পেনশনের নিশ্চয়তা নেই। ফলে তাঁদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এই কর্মীদের স্বার্থ বিবেচনা করে নতুন সরকারকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আবেদন জানিয়েছেন তিনি।
তবে নবান্নের বর্তমান উদ্যোগ মূলত তথ্য সংগ্রহ ও নিয়োগের নিয়ম যাচাইয়ের প্রক্রিয়া। এখনও পর্যন্ত অনিয়ম প্রমাণিত হয়েছে বা কোনও কর্মীর চাকরি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, এমন ঘোষণা করেনি সরকার। ৬ নভেম্বরের মধ্যে বিভিন্ন দপ্তরের রিপোর্ট জমা পড়ার পর সেগুলি পরীক্ষা করে পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক হতে পারে।
দপ্তরভিত্তিক এই যাচাইয়ে কত সংখ্যক নিয়োগের ক্ষেত্রে নিয়ম মানা হয়েছিল এবং কোথাও অনিয়মের প্রমাণ মেলে কি না, সেটাই এখন দেখার। চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের চাকরির নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়েও সরকারের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
