31 C
Kolkata
September 19, 2026
কলকাতা

যুবভারতীতে মেসি-নৈরাজ্যের নেপথ্য কাহিনি— স্যাঙাত-তন্ত্র, অপেশাদারিত্ব ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার জটিল জাল

নিজস্ব চিত্র

কলকাতা ১৬ ডিসেম্বর: যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে লিয়োনেল মেসির সফর যে ভাবে নৈরাজ্যে পরিণত হল, তার নেপথ্যে শুধু ভিড়ের উন্মাদনাই নয়— জড়িয়ে রয়েছে অপেশাদার আয়োজন, স্যাঙাত-তন্ত্রের পরামর্শ এবং প্রশাসনিক সমন্বয়ের ভয়াবহ ঘাটতি। এই গোটা ব্যবস্থাপনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ছিলেন লাল্টু দাস, যিনি শতদ্রু দত্তের সংস্থার তরফে মেসি সফরের জন্য ‘লিয়াঁজ়ো অফিসার’ হিসেবে কাজ করেছিলেন।

পুলিশ ও প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সমন্বয়ের দায়িত্ব কার্যত ছিল লাল্টুর হাতেই। যদিও আনন্দবাজার ডট কম-এর কাছে তিনি দাবি করেছেন, তিনি শতদ্রুর সংস্থার কর্মচারী নন। নিজেকে তিনি ‘বন্ধু’ বলেই পরিচয় দিয়েছেন। তবু বাস্তবে মেসির কলকাতা সফর ঘিরে প্রশাসনের সঙ্গে হওয়া একাধিক বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন তিনিই। নথিপত্রে সই না থাকলেও বিভিন্ন দপ্তরে চিঠিচাপাটি পৌঁছে দেওয়া থেকে শুরু করে পুলিশ-প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ— সব ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন কার্যত শতদ্রুর দূত।

গত শনিবার যুবভারতীতে অতিরিক্ত লোক মাঠে ঢুকে পড়ার ঘটনায় লাল্টুর ভূমিকা নিয়েই উঠেছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। কলকাতা ময়দান চেনা এই প্রাক্তন মোহনবাগান ফুটবলার নব্বইয়ের দশকে সবুজ-মেরুন জার্সিতে স্টপার হিসেবে খেলেছেন। বর্তমানে ডালহৌসি ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত লাল্টু ফুটবল থেকে অবসর নেওয়ার পরে রঙের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হলেও ময়দানের নানা কর্মকাণ্ডে সক্রিয়। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, মেসিকে ঘিরে যে জনস্রোত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তার অন্যতম ‘হোতা’ ছিলেন লাল্টু।

নিজেই স্বীকার করেছেন অপেশাদারিত্বের কথা। তাঁর বক্তব্য, ‘আমি সংস্থার কর্মচারী নই, কোনও কাগজে সই করিনি। বন্ধু হিসেবে যেখানে যেতে বলা হয়েছে গিয়েছি। তবে অপেশাদারিত্বের ছাপ ছিল।’ এই স্বীকারোক্তি কার্যত আয়োজকদের প্রস্তুতির ঘাটতিকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
এই গোটা ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে ‘স্যাঙাত-তন্ত্র’। শতদ্রু দত্তকে যাঁরা কাছ থেকে চেনেন, তাঁদের মতে তিনি একাই সব সামলাতে পছন্দ করেন, কিন্তু একইসঙ্গে কয়েক জন ঘনিষ্ঠের পরামর্শের উপর নির্ভরশীল। সেই স্যাঙাতদেরই পরামর্শে কলকাতার অনুষ্ঠানে পেশাদার ইভেন্ট সংস্থাকে বাদ দিয়ে ‘স্থানীয় প্রতিভা’ দিয়ে কাজ চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। খরচ কমানোই ছিল মূল লক্ষ্য। তার ফলেই মাঠে উঁচু মঞ্চ, হুডখোলা গাড়িতে মেসিকে ঘোরানো— এই ধরনের দর্শক-উন্মাদনা সামাল দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনাগুলি বাদ পড়ে।

কলকাতা ছাড়া মুম্বই, হায়দরাবাদ এবং দিল্লিতে কিন্তু পেশাদার সংস্থার হাতেই আয়োজনের ভার ছিল। সেখানে কোনও বিশৃঙ্খলা হয়নি। অথচ কলকাতার ক্ষেত্রেই সেই পেশাদারিত্ব অনুপস্থিত ছিল, যা নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠছে— শহরে কি অভিজ্ঞ সংস্থার অভাব ছিল, নাকি খরচ বাঁচানোর সিদ্ধান্তই সর্বনাশ ডেকে আনল?

আরও একটি বড় বিতর্কের জায়গা ইডেন গার্ডেন্স। প্রাথমিক ভাবে মেসির অনুষ্ঠান ইডেনেই হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সিএবি-র নির্ধারিত হোস্টিং ফি এবং ফোর্ট উইলিয়ামের অতিরিক্ত খরচ দিতে রাজি না হওয়ায় শেষ মুহূর্তে ভেন্যু বদলে যুবভারতী ঠিক করা হয়। প্রাক্তন সিএবি সভাপতি স্নেহাশিস গঙ্গোপাধ্যায়ের দাবি, ইডেনে হলে এই ধরনের ঘটনা ঘটত না, কারণ সেখানে মাঠে নামা বা বোতল ঢোকানোর মতো বিষয়ে অত্যন্ত কড়া নিয়ম রয়েছে।

নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও উঠেছে একাধিক প্রশ্ন। হাজার হাজার মানুষ কী ভাবে ফেন্সিং ভেঙে মাঠে ঢুকে পড়ল, দীর্ঘ সময় ধরে কী ভাবে অরাজকতা চলল, কেন পুলিশ ভিতরের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হল— এই সব প্রশ্নের উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়। পুলিশের একাংশের বক্তব্য, মেসির ‘জ়েড’ ক্যাটেগরির নিরাপত্তা কেন্দ্রীয় বাহিনীর হাতে থাকায় সমন্বয়ের ঘাটতি তৈরি হয়েছিল। পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কায় পুলিশ অনেক ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করেনি।

সব মিলিয়ে, যুবভারতীর মেসি-সফর এখন কেবল এক ব্যর্থ ইভেন্ট নয়, বরং পরিকল্পনাহীনতা, অপেশাদারিত্ব এবং স্যাঙাত-নির্ভর সিদ্ধান্তের একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। তদন্ত এগোলে এই নৈরাজ্যের নেপথ্যে আরও অনেক অজানা তথ্য সামনে আসবে বলেই মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল।

Related posts

Leave a Comment