উৎসবের আনন্দ মুহূর্তে বদলে গিয়েছিল আতঙ্ক আর আর্তনাদে। উত্তর কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গোৎসবের মণ্ডপে সপ্তমীর সন্ধ্যায় পদপিষ্টের মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় প্রাণ হারিয়েছেন বহু মানুষ। এই মর্মান্তিক ঘটনায় শোকপ্রকাশ করেছেন পুজোর থিমশিল্পী সুশান্ত শিবানী পাল। তাঁর কথায়, ‘দুর্গাপুজোর জন্য একটা কালো দিন।’ শিল্পীর দাবি, এমন বিপর্যয় কখনওই কাম্য নয়। বৃষ্টির মধ্যে ভিড়ের চাপ এবং দর্শনার্থীদের হুড়োহুড়ি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছিল বলে তিনি জানতে পেরেছেন।
চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গোৎসব সমিতির ৯১তম বর্ষের ভাবনা ছিল ‘অরব’, যার অর্থ ‘বিয়ন্ড সাউন্ড’। নীরবতার গভীরতা ও শব্দের পরিচিত গণ্ডি পেরিয়ে অন্য এক অনুভূতির জগৎ তুলে ধরার ভাবনায় সেজেছিল মণ্ডপ। দর্শনার্থীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠেছিল ৩৬০ ডিগ্রির পরিকল্পনায় তৈরি এই মণ্ডপ। কিন্তু সপ্তমীর সন্ধ্যায় সেই মণ্ডপেই ঘটে যায় মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। ঘটনার পর অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয় পুজো।
‘এমন ঘটনা একেবারেই কাম্য নয়’
দুর্ঘটনা প্রসঙ্গে সুশান্ত শিবানী পাল জানিয়েছেন, মানুষের কাছে পৌঁছনোর লক্ষ্য নিয়েই তাঁরা পুজোর শিল্পকর্ম তৈরি করেন। এর আগেও তিনি বহু পুজোর মণ্ডপ তৈরি করেছেন, যেখানে বিপুল সংখ্যক দর্শনার্থীর সমাগম হয়েছে। কিন্তু চোরবাগানের মতো দুর্ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। শিল্পীর কথায়, ‘মানুষের কাছে পৌঁছনোর জন্য আমরা কাজ করি। কিন্তু এই ঘটনা একেবারেই কাম্য নয়।’
তিনি আরও জানান, শনিবার ভোর সাড়ে ৩টে থেকে পৌনে ৪টের মধ্যে মণ্ডপের আশপাশে যে ভিড় দেখেছিলেন, তা দেখে তাঁর নিজেরও অস্বস্তি হয়েছিল। এত বিপুল সংখ্যক মানুষের সমাগম সামলানো কতটা কঠিন হতে পারে, সেই আশঙ্কা তাঁর মনে তৈরি হয়েছিল বলে জানিয়েছেন শিল্পী।
নিরাপত্তা নিয়ে কী বললেন শিল্পী?
মণ্ডপে দর্শনার্থীদের ভিড় নিয়ন্ত্রণে আগাম কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেছেন সুশান্ত। তাঁর বক্তব্য, লালবাজারের উচ্চপদস্থ পুলিশ আধিকারিকেরা মণ্ডপে এসেছিলেন এবং পরিস্থিতি খতিয়ে দেখছিলেন। দর্শনার্থীদের একাংশ প্রতিমার সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে গিয়ে চলাচলের পথে বাধা তৈরি করছিলেন। সেই সমস্যা কমাতে কাপড় দিয়ে স্তর তৈরি করে দর্শনার্থীদের দাঁড়ানোর জায়গা নিয়ন্ত্রণ করার পরামর্শ দিয়েছিলেন পুলিশ আধিকারিকেরা বলে জানিয়েছেন তিনি। শনিবার দুপুরেই সেই ব্যবস্থা করা হয়েছিল বলে তাঁর দাবি।
কিন্তু তার পরেও কীভাবে এমন বিপর্যয় ঘটল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। শিল্পীর বক্তব্য, দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার আগে পর্যন্ত পরিস্থিতি কোন দিকে এগোচ্ছিল, তা তিনি বুঝতে পারেননি। কীভাবে ভিড়ের মধ্যে হুড়োহুড়ি শুরু হল, তা জানতে তদন্ত প্রয়োজন।
প্রবেশ ও বেরোনোর পথ নিয়ে প্রশ্ন
দুর্ঘটনার সম্ভাব্য কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সুশান্ত জানিয়েছেন, প্রবল বৃষ্টির কারণে মণ্ডপের ভিতরে থাকা দর্শনার্থীদের একাংশ বেরোতে চাইছিলেন না। অন্যদিকে, বাইরে থেকে আরও মানুষ ভিতরে প্রবেশ করছিলেন বলে তিনি জানতে পেরেছেন। এর ফলে ভিড়ের মধ্যে চাপ তৈরি হয় এবং কয়েক জন পড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে বলে তাঁর অনুমান।
মণ্ডপের প্রবেশপথ ও বেরোনোর পথের মাপ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন শিল্পী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, চোরবাগানের মাঠের অংশ বড় হলেও প্রবেশের গলিটি প্রায় সাড়ে সাত থেকে আট ফুট চওড়া ছিল। ভিআইপি গেটের প্রস্থ ছিল প্রায় তিন ফুট। অন্যদিকে, বেরোনোর পথও তুলনামূলকভাবে সরু গলির দিকে চলে গিয়েছিল। ফলে মণ্ডপের ভিতরে জায়গা বড় হলেও বাইরে বেরোনোর পথে ভিড় জমলে সমস্যা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা ছিল বলে তাঁর মত।
তবে এই বিবরণ শিল্পীর বক্তব্যের ভিত্তিতে পাওয়া। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ, নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনও ঘাটতি ছিল কি না এবং কারও গাফিলতি ছিল কি না, তা তদন্তের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে।
বন্ধ চোরবাগানের পুজো
দুর্ঘটনার পর চোরবাগান সর্বজনীনের পুজো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। মণ্ডপে প্রবেশ বন্ধ থাকায় এ বছরের বিশেষ ভাবনা ‘অরব’ আর দর্শনার্থীদের দেখার সুযোগ নেই। যে পুজোকে ঘিরে সপ্তমীর সন্ধ্যায় হাজার হাজার মানুষের উৎসাহ ছিল, সেখানে এখন শোক ও উদ্বেগের পরিবেশ।
সুশান্ত শিবানী পালের কথায়, আতঙ্ক, ভয় এবং বৃষ্টি থেকে বাঁচার তাগিদ পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছিল। কিন্তু কোনও কারণেই এমন প্রাণহানির ঘটনা মেনে নেওয়া যায় না। এখন দুর্ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, আহতদের চিকিৎসা এবং নিহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোই সবচেয়ে জরুরি।
