সংবাদ কলকাতা: পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দপ্তরের প্রশাসনিক পরিকাঠামো ঢেলে সাজাতে একগুচ্ছ পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বুধবার বিধাননগরে দপ্তরের পর্যালোচনা বৈঠক থেকে তিনি জানালেন, নিউটাউনে পাঁচ একর জমির উপর তৈরি হবে নতুন পঞ্চায়েত ভবন। পাশাপাশি ৭১৯০টি স্থায়ী পদে নিয়োগের পাশাপাশি এক বছরের জন্য আরও ১০০০ জন চুক্তিভিত্তিক কর্মী নেওয়া হবে। স্থায়ী নিয়োগের প্রক্রিয়া ২০২৭ সালের এপ্রিলের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্যমাত্রাও ঘোষণা করেছেন তিনি। গ্রামীণ কর্মসংস্থান এবং আবাসন প্রকল্পের কাজ দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশও দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
বুধবারের এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ, কৃষিমন্ত্রী দুধকুমার মণ্ডল, পঞ্চায়েত প্রতিমন্ত্রী শান্তনু প্রামাণিক-সহ দপ্তরের আধিকারিকেরা। বৈঠকে পঞ্চায়েতের কাজের অগ্রগতি, কর্মী-সংকট এবং কেন্দ্রীয় প্রকল্পের বরাদ্দের ব্যবহার নিয়ে আলোচনা হয়।
নতুন পঞ্চায়েত ভবনের জন্য নিউটাউনে পাঁচ একর জমি দেওয়ার কথা ঘোষণা করে মুখ্যমন্ত্রী জানান, প্রস্তাবিত কলকাতা হাই কোর্ট ও বিধানসভার ভবনের কাছাকাছি এই জমি বরাদ্দ করা হবে। সেখানে তৈরি হবে পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দপ্তরের পূর্ণাঙ্গ কার্যালয়। তাঁর বক্তব্য, নতুন ভবন থেকে দপ্তরের কাজকর্ম পরিচালনা এবং বিভিন্ন প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনা আরও সুসংগঠিত ভাবে করা সম্ভব হবে।
দপ্তরে দীর্ঘদিনের কর্মী-সংকট মেটাতে ৭১৯০টি স্থায়ী পদে নিয়োগের সিদ্ধান্তের কথাও জানান শুভেন্দু। এই নিয়োগ হবে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বিধি সংশোধনের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। সেই উদ্দেশ্যে দীপাবলির পরে বিশেষ বিধানসভা অধিবেশন ডেকে প্রয়োজনীয় বিল পেশ করা হবে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর লক্ষ্য, ২০২৭ সালের এপ্রিলের মধ্যে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করা। পাশাপাশি কাজের তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটাতে এক বছরের জন্য আরও ১০০০ জন চুক্তিভিত্তিক কর্মী নিয়োগ করা হবে।
গ্রামীণ কর্মসংস্থান প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়েও বৈঠকে একাধিক তথ্য তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। ‘ভিবি-জি রাম জি’ প্রকল্পের আওতায় পশ্চিমবঙ্গে ২২ কোটি কর্মদিবস তৈরির লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। শুভেন্দুর দাবি, এখনও পর্যন্ত রাজ্যে ৬৫ লক্ষ ৬২ হাজার কর্মদিবস তৈরি হয়েছে। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ৭ লক্ষ ৯ হাজার কর্মদিবস তৈরি হচ্ছে। চলতি অর্থবর্ষের বাকি সময়ে কেন্দ্রের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার দিকে এগিয়ে যেতে প্রশাসনকে আরও সক্রিয় হওয়ার বার্তা দিয়েছেন তিনি।

প্রকল্পের অর্থ বরাদ্দ এবং খরচের বিষয়েও মুখ্যমন্ত্রী বিস্তারিত তথ্য দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, কেন্দ্র ও রাজ্যের যৌথ উদ্যোগে গ্রামীণ কর্মসংস্থান প্রকল্পের অধীনে ১২ হাজার কোটি টাকার বেশি কাজের পরিকল্পনা হয়েছে। কেন্দ্রের পাশাপাশি রাজ্যও এই প্রকল্পে অর্থের জোগান দেবে। প্রথম পর্যায়ে কেন্দ্রের তরফে প্রায় ১২০০ কোটি টাকা রাজ্যে এসেছে বলে জানিয়েছেন তিনি। হাতে সময় কম থাকলেও বরাদ্দ অর্থ যথাযথ ভাবে খরচ করে কর্মদিবস তৈরির লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে চান মুখ্যমন্ত্রী।
জব কার্ড নিয়েও একাধিক তথ্য প্রকাশ করেছেন শুভেন্দু। তাঁর দাবি, আধার ও কেওয়াইসি যাচাইয়ের সময় প্রায় ৩১ লক্ষ ভুয়ো জব কার্ড বাতিল হয়েছে। কেন্দ্রের অনুমোদনের পরে জনকল্যাণ শিবির, সেবা সেতু এবং সংকল্প অভিযানের মাধ্যমে প্রায় ১০ লক্ষ নতুন জব কার্ড দেওয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি। যোগ্য গ্রামীণ পরিবার যাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয়, সেই বিষয়ে নজর রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী গ্রামীণ আবাস যোজনার কাজের অগ্রগতিও পর্যালোচনা করা হয়েছে বৈঠকে। মুখ্যমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক সমীক্ষায় রাজ্যে প্রায় ৫৪ লক্ষ বাড়ির নাম উঠে এসেছিল। পরবর্তী যাচাইয়ের পরে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৭ লক্ষে। আগামী দুই অর্থবর্ষের মধ্যে চিহ্নিত বাড়িগুলির নির্মাণকাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে রাজ্য সরকার।
বৈঠকে শুভেন্দু বলেন, সরকার গঠনের পর হাতে পূর্ণ ১২ মাসের সময় পাওয়া যায়নি। ভোট অন অ্যাকাউন্টের ভিত্তিতে কাজ শুরু করতে হয়েছে। তা সত্ত্বেও বাকি সময়ের মধ্যে ২২ কোটি কর্মদিবস তৈরির লক্ষ্যমাত্রা পূরণ এবং বরাদ্দ অর্থের যথাযথ ব্যবহার করতে চায় সরকার। পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দপ্তরকে দেশের মধ্যে একটি মডেল দপ্তর হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয়ও জানিয়েছেন তিনি।
নতুন ভবন তৈরি, স্থায়ী ও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ, গ্রামীণ কর্মসংস্থান এবং আবাসন প্রকল্প— সব মিলিয়ে পঞ্চায়েত দপ্তরের কাজের গতি বাড়াতে চাইছে রাজ্য সরকার। তবে ঘোষিত সময়সীমার মধ্যে নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করা এবং প্রকল্পগুলির লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করাই এখন প্রশাসনের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ।
