October 30, 2026
রাজ্য

রাজনৈতিক হিংসায় নিহতদের পরিবারকে সরকারি চাকরি

বাম ও তৃণমূলের ২৫ বছরের ঘটনাই বিবেচনায়

সংবাদ কলকাতা: রাজনৈতিক হিংসায় প্রাণ হারানো ব্যক্তিদের পরিবারের পাশে দাঁড়াতে বড় পদক্ষেপ করতে চলেছে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকার। গত ২৫ বছরে রাজ্যে রাজনৈতিক হিংসার ঘটনায় নিহতদের পরিবারের একজন সদস্যকে সরকারি চাকরি দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। শুধু তৃণমূল আমলের ঘটনা নয়, বামফ্রন্ট সরকারের শেষ ১০ বছরের রাজনৈতিক হিংসায় নিহতদের পরিবারকেও এই প্রকল্পের আওতায় আনার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে নবান্ন সূত্রে খবর। ইতিমধ্যেই মন্ত্রিসভায় প্রস্তাবটি অনুমোদন পেয়েছে। প্রশাসনিক সূত্রের দাবি, আইনি দিক থেকেও মিলেছে সম্মতি।

লোকসভা, বিধানসভা এবং ত্রিস্তর পঞ্চায়েত নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক সংঘর্ষ ও হিংসার ঘটনায় যাঁরা প্রাণ হারিয়েছেন, তাঁদের পরিবার এই প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার জন্য আবেদন করতে পারবে। তবে কারা এই সুবিধার যোগ্য হবেন, কীভাবে আবেদন করতে হবে এবং নিয়োগের শর্ত কী হবে, তা সরকারি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পরই স্পষ্ট হবে।

প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রকল্পটি কার্যকর করতে শীঘ্রই বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হতে পারে। সেখানে আবেদন জমা দেওয়ার পদ্ধতি এবং প্রয়োজনীয় নথির তালিকা জানানো হবে। সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলিকে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে আবেদন করতে হবে। নিহত ব্যক্তির মৃত্যুর কারণ, ঘটনার সময় ও পরিস্থিতি এবং রাজনৈতিক হিংসার সঙ্গে মৃত্যুর যোগসূত্রের প্রমাণ জমা দিতে হবে আবেদনকারীদের।

এর পর জেলাশাসকের দপ্তর আবেদনপত্র ও জমা দেওয়া নথি খতিয়ে দেখবে। প্রয়োজন হলে পুলিশের কাছ থেকেও রিপোর্ট চাওয়া হতে পারে। প্রশাসনিক স্তরে যাচাইয়ের পর যোগ্য আবেদনগুলিই নবান্নে পাঠানো হবে। সমস্ত তথ্য ও পরিস্থিতি বিবেচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে রাজ্য সরকার।

এই প্রকল্পকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলে ইতিমধ্যেই আলোচনা শুরু হয়েছে। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর ভোট পরবর্তী হিংসায় খুন হয়েছিলেন বিজেপি কর্মী অভিজিৎ সরকার। সেই মৃত্যুর মামলা এখনও আদালতে বিচারাধীন। সরকারের নতুন সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন অভিজিতের দাদা বিশ্বজিৎ সরকার। তাঁর বক্তব্য, রাজনৈতিক হিংসায় নিহত ব্যক্তি যে দলেরই হোন না কেন, তাঁর পরিবারকে অসহনীয় পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। মুখ্যমন্ত্রী সেই যন্ত্রণার বিষয়টি বুঝেছেন বলেই শুধু তৃণমূল জমানা নয়, বাম আমলের ঘটনাকেও প্রকল্পের আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁর মতে, এটি একটি ইতিবাচক উদ্যোগ।

বিজেপির মুখপাত্র দেবজিৎ সরকারও এই সিদ্ধান্তকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন। তাঁর বক্তব্য, গত ২৫ বছরে বাংলায় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বহু হিংসার ঘটনা ঘটেছে। প্রাণহানির পাশাপাশি অসংখ্য পরিবারকে আর্থিক ও সামাজিক সংকটের মুখে পড়তে হয়েছে। ভোট পরবর্তী হিংসাকে বাংলার রাজনীতির একটি উদ্বেগজনক বাস্তবতা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, অতীতে রাজনৈতিক হিংসায় নিহতদের পরিবারকে সরকারি সহায়তা দেওয়ার এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকতে পারে।

তবে প্রকল্পের উদ্দেশ্য ও পরিধি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সিপিএম নেতা বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য। তাঁর প্রশ্ন, বামফ্রন্ট সরকারের শেষ ১০ বছরের ঘটনাকে এই হিসাবের মধ্যে রাখার যুক্তি কী? তাঁর আশঙ্কা, এই প্রকল্পের মাধ্যমে ঘুরপথে বিজেপি কর্মীদের পরিবারের সদস্যদের সরকারি চাকরি দেওয়ার চেষ্টা হতে পারে। সরকারি নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক প্রয়োজন এবং সাংবিধানিক নীতির বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা উচিত বলে তিনি মনে করেন।

অন্যদিকে, নিয়োগের পদ্ধতি ও চাকরির স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জয়নগরের সাংসদ প্রতিমা মণ্ডল। তাঁর বক্তব্য, রাজনৈতিক হিংসায় নিহতদের পরিবারের সদস্যদের চাকরি দেওয়ার নজির অতীতেও রয়েছে। কিন্তু পরীক্ষা ছাড়া স্থায়ী সরকারি চাকরি দেওয়ার ক্ষেত্রে কী নিয়ম অনুসরণ করা হবে, তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে, রাজনৈতিক হিংসায় নিহতদের পরিবারকে সরকারি চাকরি দেওয়ার এই উদ্যোগ ঘিরে রাজ্যে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। একদিকে বিজেপি এই সিদ্ধান্তকে মানবিক ও তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে, অন্যদিকে বিরোধীরা নিয়োগের স্বচ্ছতা, সাংবিধানিক বৈধতা এবং প্রকল্পের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। এখন নজর সরকারি বিজ্ঞপ্তির দিকে। সেখানেই স্পষ্ট হবে কারা এই সুবিধা পাবেন এবং কী প্রক্রিয়ায় তাঁদের পরিবারের একজন সদস্যকে সরকারি চাকরিতে নিয়োগ করা হবে।

Related posts

Leave a Comment