29 C
Kolkata
October 22, 2026
Featured

দুর্গাপুজোর ‘পুণ্য মাটি’ ঘিরে সমাজের দ্বিচারিতা তুলে ধরলেন হেমশ্রী

সংবাদ কলকাতা: দুর্গাপুজোর আবহে অভিনব ফটো সিরিজের মাধ্যমে সমাজের প্রচলিত দ্বিচারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেন কলকাতার পরিচিত ডিজিটাল ক্রিয়েটর হেমশ্রী ভদ্র। নারীশক্তির প্রতীক হিসেবে দেবী দুর্গার আরাধনা করা হলেও বাস্তব জীবনে নারীদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি কতটা সম্মানজনক, সেই প্রশ্নই নিজের শিল্পভাবনায় তুলে ধরেছেন তিনি। তাঁর বার্তা, দেবীর প্রতি শ্রদ্ধা যদি সত্যিই আন্তরিক হয়, তবে বাস্তব জীবনেও প্রত্যেক নারীর মর্যাদা ও সম্মান নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

মা দুর্গার সুসজ্জিত প্রতিমাকে সামনে রেখে তৈরি এই ফটো সিরিজে হেমশ্রীকে দেখা গিয়েছে ঐতিহ্যবাহী সাদা শাড়ি ও লাল ব্লাউজে। ছবিগুলিতে ব্যবহৃত বিভিন্ন দৃশ্য ও প্রতীক সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি, নারীর পরিচয় এবং সম্মান পাওয়ার অধিকার নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে।

একটি ছবিতে হেমশ্রীকে দু’হাতে এক ব্যক্তির দিকে মাটি এগিয়ে দিতে দেখা গিয়েছে। মাথা নিচু করে সেই মাটি গ্রহণ করছেন ওই ব্যক্তি। অন্য একটি ছবিতে এক রূপটানশিল্পী তাঁর চোখে কাজল পরিয়ে দিচ্ছেন। আরও একটি দৃশ্যে ক্যামেরা, আলো এবং শুটিংয়ের সঙ্গে যুক্ত কলাকুশলীদের উপস্থিতি দেখা যায়। সেখানে হাতে ধরা একটি আয়না হেমশ্রীর মুখ আড়াল করে রেখেছে। প্রতিটি দৃশ্যের মধ্যেই রয়েছে আলাদা প্রতীকী তাৎপর্য।

এই ফটো সিরিজের কেন্দ্রে রয়েছে বাংলার দুর্গাপ্রতিমা নির্মাণের ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত ‘পুণ্য মাটি’। প্রচলিত একটি প্রথা অনুযায়ী, দুর্গাপ্রতিমা তৈরির মাটির সঙ্গে যৌনকর্মীদের বাড়ির দোরগোড়া থেকে সংগ্রহ করা মাটিও মেশানো হয়। এই রীতির তাৎপর্যকে সামনে রেখেই সমাজের এক গভীর বৈপরীত্য তুলে ধরতে চেয়েছেন হেমশ্রী।

যে মাটিকে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে পবিত্র বলে গ্রহণ করা হয়, সেই মাটির সঙ্গে যাঁদের জীবন ও বসবাসের যোগ রয়েছে, তাঁদেরই অনেক সময় সমাজের একাংশ অবজ্ঞা ও নৈতিক বিচারের চোখে দেখে। ধর্মীয় রীতিতে কোনও উপাদানকে পবিত্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলেও, সেই উপাদানের সঙ্গে যুক্ত মানুষকে সমান মর্যাদা দেওয়া হয় কি না, সেই প্রশ্নই সামনে এনেছে এই ফটো সিরিজ।

এ প্রসঙ্গে হেমশ্রী ভদ্রের বক্তব্য, ‘পবিত্র মাটি গ্রহণ করার জন্য মানুষ মাথা নত করে, অথচ যে নারী সেই মাটি দেন, তাঁকেই সমাজ বহু সময় নিচু চোখে দেখে। তাঁর দেওয়া মাটি যদি দেবীর জন্য পবিত্র হতে পারে, তাহলে তাঁর মর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে কেন? পুজো আমাদের সম্মান করতে শেখাক, বেছে বেছে কাউকে সম্মান করতে নয়।’

ফটো সিরিজটিতে নারীর সামাজিক অবস্থানের পাশাপাশি তাঁর প্রকাশ্য পরিচয় এবং তাঁকে দেখার সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। রূপটানের তুলি, আয়না ও ক্যামেরাকে প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে, কীভাবে একজন নারীকে অন্যের চোখ দিয়ে বিচার করা হয় এবং কীভাবে তাঁর পরিচয়কে নির্দিষ্ট কিছু ধারণার মধ্যে আটকে দেওয়া হয়।

অনেক ক্ষেত্রেই একজন নারীর ব্যক্তিত্ব, মানবিকতা কিংবা কাজের পরিবর্তে তাঁর পোশাক, চেহারা, সৌন্দর্য বা পেশাকে গুরুত্ব দিয়ে বিচার করা হয়। সেই প্রবণতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে এই শিল্পভাবনা। আয়নায় মুখ আড়াল করা কিংবা ক্যামেরার সামনে একজন নারীর উপস্থিতি—এই দৃশ্যগুলির মধ্য দিয়ে ব্যক্তিগত পরিচয় ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির সংঘাতকে প্রতীকীভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

তবে হেমশ্রীর এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য দেবী দুর্গার প্রতি মানুষের বিশ্বাস বা ভক্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করা নয়। বরং দুর্গাপুজোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা শ্রদ্ধা, শক্তি ও মর্যাদার মূল্যবোধকে বাস্তব জীবনেও প্রতিষ্ঠা করার আহ্বান জানায় এই ফটো সিরিজ। দেবীকে নারীশক্তির প্রতীক হিসেবে পুজো করার পাশাপাশি সমাজের প্রত্যেক নারীর প্রতি সম্মানজনক আচরণ কতটা জরুরি, সেই ভাবনাই সামনে এসেছে তাঁর ছবিতে।

দুর্গাপুজো শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, বাংলার সংস্কৃতি ও সামাজিক জীবনেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সেই উৎসবের পরিচিত প্রতীককে ব্যবহার করে হেমশ্রী এমন একটি প্রশ্ন তুলেছেন, যা পুজোর মণ্ডপের বাইরেও প্রাসঙ্গিক। যে সমাজ দেবীকে মাতৃশক্তি হিসেবে আরাধনা করে, সেই সমাজে প্রত্যেক নারীর সম্মান, স্বাধীনতা ও মানবিক মর্যাদা কি সমান গুরুত্ব পায়?

এই ফটো সিরিজের মূল বার্তা স্পষ্ট—দেবীর প্রতি শ্রদ্ধা এবং বাস্তব জীবনে নারীর প্রতি অবজ্ঞা পাশাপাশি চলতে পারে না। পুজোর আচার-অনুষ্ঠানে সম্মানের যে মূল্যবোধ প্রকাশ পায়, তা যদি দৈনন্দিন জীবনেও প্রতিফলিত হয়, তবেই সেই শ্রদ্ধা পূর্ণতা পাবে।

Related posts

Leave a Comment