বাংলার দুর্গাপুজোর ইতিহাসে ব্যতিক্রমী নজির পূর্ব বর্ধমানের কেতুগ্রাম ব্লকের খাটুন্দি গ্রামের ভট্টাচার্য পরিবার। একই উঠোনে পাশাপাশি সাতটি দুর্গাপ্রতিমা, একসঙ্গে পুজোর আয়োজন এবং শাক্ত ও বৈষ্ণব রীতির মেলবন্ধন— কয়েকশো বছর ধরে এই পরম্পরাই বহন করে চলেছে পরিবারটি। ‘সাত বাড়ির পুজো’ নামে পরিচিত এই ঐতিহ্যবাহী দুর্গোৎসবকে ঘিরে আজও রয়েছে নানা প্রাচীন আচার, পারিবারিক ইতিহাস এবং লোকবিশ্বাস।
পরিবারের সদস্যদের দাবি, খাটুন্দি গ্রামে জনপদ গড়ে ওঠারও আগে এই পুজোর সূচনা হয়েছিল। তাঁদের মতে, ইতিহাসের বয়স ৬০০ বছরেরও বেশি। চৈতন্যদেবের সময়কালের আগেই ভট্টাচার্য পরিবারে দুর্গার আরাধনা শুরু হয়েছিল বলে জানান পরিবারের সদস্যরা। প্রথমে একটি প্রতিমা প্রতিষ্ঠা করে পুজো শুরু হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে বংশের বিস্তার এবং শরিকি ভাগাভাগির সঙ্গে সঙ্গে দুর্গাপ্রতিমার সংখ্যাও বাড়তে থাকে। বর্তমানে একই উঠোনে সাতটি দুর্গাপ্রতিমার পুজো হয়।
পরিবারের অষ্টম পুরুষের সদস্য তথা পুজোর অন্যতম পরিচালক বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এই প্রাচীন পুজোর ইতিহাস তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পরিবারের পূর্বপুরুষ রামগোপাল ভট্টাচার্য গ্রামে দুর্গাপুজোর প্রচলন করেন। সেই সময় এলাকায় আজকের মতো জনবসতি গড়ে ওঠেনি। কেশব ভারতীর দুই ছেলে নিশাপতি ও উমাপতির বংশধরদের হাত ধরে পরিবারের বিভিন্ন শাখায় পুজোর বিস্তার ঘটে। সময়ের সঙ্গে শরিকি বিভাজন তৈরি হলেও পুজোর মূল আচার-অনুষ্ঠান ও পরম্পরা অটুট রয়েছে।
পরিবারের বর্তমান প্রজন্মের ঈস্পিতা ভট্টাচার্য থেকে শুরু করে প্রবীণ সদস্য ছায়ারানী ভট্টাচার্যের কথাতেও উঠে এসেছে এই পুজোর দীর্ঘ ইতিহাস। একসময় পুজোর খরচ জোগাড় করতে পরিবারের পূর্বপুরুষদের মাসখানেক আগে থেকেই শিষ্যদের বাড়ি বাড়ি যেতে হতো। ভিক্ষা করে যা পাওয়া যেত, তা দিয়েই দুর্গোৎসবের আয়োজন করা হতো। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও পুজোর ধারাবাহিকতা বজায় রাখার এই ইতিহাস পরিবারের কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
এই পুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য শাক্ত ও বৈষ্ণব রীতির মেলবন্ধন। পরিবারের সদস্যদের কথায়, প্রথম থেকেই কৃষ্ণের কৃপা লাভের আকাঙ্ক্ষায় বৈষ্ণব ভাবধারার সঙ্গে শাক্ত রীতির সমন্বয় ঘটিয়ে দুর্গার আরাধনা করা হয়। শরিকি বিবাদ ও পারিবারিক বিভাজনের কারণে এক প্রতিমার পুজো থেকে ধীরে ধীরে সাত প্রতিমার পুজোর প্রচলন হলেও আচার-অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে বিশেষ কোনও পরিবর্তন হয়নি বলেই দাবি পরিবারের।
প্রাচীন পুঁথি অনুসরণ করেই আজও পুজোর নিয়মকানুন পালন করা হয়। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, এক উঠোনে ১৪ জন পুরোহিত একসঙ্গে বসে সাতটি দুর্গার পুজো করেন। সব প্রতিমার আরাধনা একই সময়ে সম্পন্ন হয়। পুজোর নিয়ম পালনের সময় ‘দুর্গা ভক্তি তরঙ্গিণী’ অনুসরণ করে স্মরণ করা হয় কেষ্ট রাইকেও। পরিবারের দাবি, কেষ্ট রাইকে স্মরণ করেই বলিদানের আচার সম্পন্ন হয়।
সাত প্রতিমার সামনে পঞ্চঘট স্থাপনও এই পুজোর অন্যতম বিশেষ বৈশিষ্ট্য। পরিবারের সদস্যদের মতে, এমন আয়োজন সচরাচর দেখা যায় না। সন্ধিপুজো থেকে নবমী পর্যন্ত বলিদানের রীতি চলে। অষ্টমীতেও বলিদান করা হয়, যা পরিবারের দীর্ঘদিনের প্রথা বলে জানানো হয়েছে। এ ক্ষেত্রে শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা ও পারিবারিক বিশ্বাসের নিজস্ব পরম্পরা রয়েছে।
বিজয়া দশমীতেও এই পুজোয় থাকে বিশেষ আয়োজন। সাতটি প্রতিমাকে একসঙ্গে নাটমন্দিরে রেখে বিশেষ গান গেয়ে প্রার্থনা করা হয়। একসঙ্গে হয় আরতি। এরপর নিয়ম মেনে সম্পন্ন হয় বিসর্জনের অনুষ্ঠান। পরিবারের লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, বিজয়ার দিন আকাশে শঙ্খচিলের উড়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখা শুভ লক্ষণ। সেই দৃশ্য দর্শনের পরেই পরিবারের সদস্যরা বাড়ি ফেরেন।
সময়ের সঙ্গে বদলেছে সমাজ, বদলেছে জীবনযাত্রা। কিন্তু খাটুন্দির ভট্টাচার্য পরিবারের উঠোনে সাত দুর্গার একসঙ্গে আরাধনা আজও বহন করে চলেছে বহু প্রজন্মের স্মৃতি। পারিবারিক ঐতিহ্য, প্রাচীন পুঁথির নির্দেশ এবং শাক্ত-বৈষ্ণব ভাবধারার মেলবন্ধনে ‘সাত বাড়ির পুজো’ শুধু একটি ধর্মীয় আয়োজন নয়, পূর্ব বর্ধমানের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও এক অনন্য নিদর্শন।
previous post
