30 C
Kolkata
October 18, 2026
রাজ্য

চোরবাগানের পুজো বন্ধ, বাতিল অমিত শাহের সব কর্মসূচি

সংবাদ কলকাতা— চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গাপুজোর মণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের মৃত্যুর ঘটনায় বন্ধ করে দেওয়া হল ওই পুজো। সপ্তমীর রাতের মর্মান্তিক বিপর্যয়ের পর এই সিদ্ধান্তের কথা জানান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ২৫ জন। তাঁদের মধ্যে কয়েক জনের অবস্থা গুরুতর বলে খবর। এই বিপর্যয়ের জেরে কলকাতার একাধিক বড় পুজোমণ্ডপে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে তৎপর হয়েছে প্রশাসন। টালা প্রত্যয়, চেতলা অগ্রণী-সহ বিভিন্ন পুজোকে ঘিরে কড়া পদক্ষেপ করা হয়েছে। অন্য দিকে, দুর্ঘটনার দিনেই কলকাতায় আসা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ রবিবারের সমস্ত কর্মসূচি বাতিল করেছেন। শোকপ্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গাঁধী-সহ একাধিক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব।

সপ্তমীর সন্ধ্যায় চোরবাগানের পুজোমণ্ডপে ঠাকুর দেখতে দর্শনার্থীদের বিপুল ভিড় জমেছিল। সেই সময় কলকাতার বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টি হচ্ছিল। বৃষ্টি থেকে বাঁচতে দর্শনার্থীদের তাড়াহুড়ো এবং মণ্ডপে অতিরিক্ত ভিড়ের জেরে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গিয়েছে। একসময় পদপিষ্ট হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। তাতেই প্রাণ হারান ১৯ জন। আহত ২৫ জনকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে কয়েক জনের আঘাত গুরুতর বলে জানা গিয়েছে। ঘটনার পরই চোরবাগানের পুজো বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এই দুর্ঘটনার দিনেই কলকাতায় এসেছিলেন অমিত শাহ। রবিবার তাঁর একাধিক কর্মসূচি ছিল। বেলুড় মঠে গিয়ে পুজো দেওয়া ও প্রতিমা দর্শনের পাশাপাশি বালির দেশবন্ধু ক্লাব, চেতলা ২৪ পল্লি, শোভাবাজার রাজবাড়ি এবং শ্রীভূমি স্পোর্টিং ক্লাবের দুর্গাপুজো দেখার কথা ছিল কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর। কিন্তু চোরবাগানের বিপর্যয়ের পর সেই সব কর্মসূচি বাতিল করা হয়েছে।

সমাজমাধ্যমে শোকপ্রকাশ করে শাহ জানিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গে রবিবারের সমস্ত কর্মসূচি বাতিল করে আহতদের সঙ্গে হাসপাতালে দেখা করতে যাবেন তিনি। তাঁর কথায়, ‘মা দুর্গার কাছে প্রার্থনা করি, আহতেরা যেন দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠেন।’ দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গেও তাঁর কথা হয়েছে বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও শোকপ্রকাশ করেছেন। স্থানীয় প্রশাসনের তরফে দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের সব রকম সাহায্য করা হবে বলে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, দুর্ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে ঘটনার অনুসন্ধান করা হবে। মৃতদের পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাসও দিয়েছেন তিনি। চোরবাগানের পাশাপাশি কলকাতার আরও কয়েকটি পুজোমণ্ডপে দর্শনার্থীদের প্রবেশ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। চেতলা অগ্রণী ও অ্যালেন পার্কের পুজো শনিবার রাতে কিছুক্ষণের জন্য বন্ধ করা হয়। সন্তোষ মিত্র স্কোয়্যারের অন্যতম উদ্যোক্তা তথা বিধায়ক সজল ঘোষ সমাজমাধ্যমে লাইভ করে দর্শনার্থীদের ধীরে ধীরে মণ্ডপ ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার আবেদন জানান। তিনি বলেন, ‘আজকের দিনটা অন্তত ফিরে যান। একেবারে নয় কিন্তু ধাপে ধাপে শাটডাউন করা হবে। তবে পুজো বন্ধ হবে না।’ চালতাবাগান লোহাপট্টি পুজো কমিটির তরফেও দর্শনার্থীদের জন্য মণ্ডপ বন্ধ রাখার কথা জানানো হয়।



দুর্ঘটনা নিয়ে শোকপ্রকাশ করেছেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। তিনি জানিয়েছেন, ঘটনার তদন্তে উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। পুজো কমিটির কয়েক জন সদস্য ও দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ আধিকারিকদের থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, অপরাধীদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আহত ও নিহতদের পরিবারের সঙ্গে রাজ্য সরকারের তরফে যোগাযোগ করা হচ্ছে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে থাকার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

চোরবাগানের বিপর্যয় নিয়ে সরব হয়েছে ওয়েস্ট বেঙ্গল জুনিয়র ডক্টরস ফ্রন্টও। সংগঠনটির অভিযোগ, চরম গাফিলতি ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার কারণেই এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। মণ্ডপে পর্যাপ্ত অ্যাম্বুল্যান্স ও পুলিশ ছিল না বলেও দাবি করেছে তারা। ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহির দাবি জানিয়েছে চিকিৎসকদের সংগঠন। পাশাপাশি আহতদের চিকিৎসা, উদ্ধারকাজ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে সব রকম সহায়তা দেওয়ার জন্য রাজ্য সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছে তারা।

লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গাঁধী সমাজমাধ্যমে শোকপ্রকাশ করে ঘটনাটিকে অত্যন্ত বেদনাদায়ক বলে উল্লেখ করেছেন। নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানানোর পাশাপাশি আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করেছেন তিনি। উপযুক্ত চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করার জন্য প্রশাসনের কাছে আবেদন জানিয়েছেন রাহুল। ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিও তুলেছেন তিনি। পশ্চিমবঙ্গের কংগ্রেস কর্মীদের উদ্ধার ও ত্রাণকাজে সাহায্য করার আহ্বান জানিয়েছেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা।

রাজ্যসভার বিরোধী দলনেতা মল্লিকার্জুন খড়গেও শোকপ্রকাশ করেছেন। নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেছেন তিনি। উদ্ধারকাজ ও চিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মৃত ও আহতদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার আবেদন জানিয়েছেন খড়গে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তিনি।

চোরবাগানের মর্মান্তিক ঘটনা দুর্গাপুজোর ভিড় নিয়ন্ত্রণ, জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা এবং বড় পুজোমণ্ডপে নিরাপত্তার প্রস্তুতি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। তদন্তে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ ও সম্ভাব্য গাফিলতি কতটা ছিল, তা স্পষ্ট হওয়ার অপেক্ষায় এখন মৃতদের পরিবার এবং শহরবাসী।

Related posts

Leave a Comment