30 C
Kolkata
October 18, 2026
রাজ্য

চোরবাগান বিপর্যয়ে দায় কার, প্রশ্নের মুখে পুলিশ ও আয়োজকরা

সংবাদ কলকাতা— চোরবাগানের দুর্গাপুজো মণ্ডপে সপ্তমীর সন্ধ্যায় পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের মৃত্যুর ঘটনায় দায় কার, তা নিয়ে বিতর্ক ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। স্থানীয়দের একাংশ পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, উদ্ধারকাজে পুলিশ সাহায্য করেছে বলে তিনি আহত ও মৃতদের পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে জেনেছেন। তবে একই সঙ্গে পুজো আয়োজকদের ত্রুটি এবং স্থানীয় পুলিশের নজরদারি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, ভিড় সামলানোর দায়িত্বে থাকা অস্থায়ী হোমগার্ডদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

রবিবার সকালে ভবানী ভবনে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকের পর মুখ্যমন্ত্রী জানান, চোরবাগানকাণ্ডের তদন্তে তথ্য অনুসন্ধানকারী দল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কলকাতার বিভিন্ন পুজো মণ্ডপে নিরাপত্তা ও ভিড় নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা খতিয়ে দেখতে বিশেষ দল পাঠানো হবে। মণ্ডপে কোনও ত্রুটি ধরা পড়লে ঘটনাস্থলেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিতে পারবেন ওই দলের সদস্যরা।

স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, দুর্ঘটনার পর পুলিশকে ডেকেও পাওয়া যায়নি। তাঁদের দাবি, আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে হয়েছে তাঁদেরই। এই অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে শুভেন্দু বলেন, তিনি কয়েক জনের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, পুলিশ অ্যাপ ক্যাবের ব্যবস্থা করে আহতদের হাসপাতালে পাঠাতে সাহায্য করেছিল। ফলে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ওঠা অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে তদন্তের প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়েছে।

মুখ্যমন্ত্রী এ দিন বিশেষ করে অস্থায়ী হোমগার্ডদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর দাবি, ওই কর্মীরা গত দু’বছর ধরে পুজোর সময় দায়িত্ব পালন করছেন এবং এ বার ছিল তাঁদের তৃতীয় বছর। তাঁদের সম্পূর্ণ তালিকা চেয়ে পাঠানো হয়েছে বলেও জানান তিনি। শুভেন্দুর বক্তব্য, শনিবার রাতে ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁর মনে হয়েছে, মণ্ডপের প্রবেশ ও বেরোনোর পথ কার্যত একই জায়গায় ছিল। দড়ি দিয়ে পথ ভাগ করা হয়েছিল। বৃষ্টি শুরু হওয়ার পর দায়িত্বে থাকা হোমগার্ডরা দড়ি ফেলে চলে যাওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে বলে তাঁর আশঙ্কা।

পূর্বতন সরকারের আমলে নিয়োগ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে কটাক্ষ করেও মুখ্যমন্ত্রী বলেন, এখনও অনেক ‘আবর্জনা’ বয়ে চলতে হচ্ছে। তবে অস্থায়ী হোমগার্ডদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা তদন্তের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে।

চোরবাগানকাণ্ডে রাতভর জিজ্ঞাসাবাদের পর রবিবার সকালে সাত জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ধৃতদের মধ্যে পুজো কমিটির কয়েক জন কর্তা, ভিআইপি পাস সামলানো এবং ভিড় নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের পাশাপাশি একটি বেসরকারি নিরাপত্তা সংস্থার দুই কর্মী রয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। তবে পুজো কমিটির সঙ্গে যুক্ত অন্য ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়ে পুলিশের তরফে এখনও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।



মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, ২০ ও ২১ অক্টোবর মৃতদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করে আর্থিক সাহায্য পৌঁছে দেওয়া হবে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে মৃতদের পরিবারের হাতে ২৫ লক্ষ টাকা করে তুলে দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন তিনি। ময়নাতদন্তের পর ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও ডিএসপি পদমর্যাদার আধিকারিকেরা দেহ পরিবারের হাতে তুলে দেওয়ার সময় উপস্থিত থাকবেন এবং শেষকৃত্য পর্যন্ত তাঁদের পাশে থাকবেন। শোকের কারণে পরিবারের কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁর চিকিৎসার ব্যবস্থাও করা হবে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।

দুর্ঘটনায় আহতদের জন্যও আর্থিক সাহায্যের ঘোষণা করা হয়েছে। আগামী ২৬ অক্টোবর মিলন মেলায় আড়ম্বরহীন বিজয়া সম্মিলনীর আয়োজন করা হবে। সেখানে কলকাতা ও পাঁচটি কমিশনারেট এলাকার পুজো উদ্যোক্তাদের আমন্ত্রণ জানানো হবে। চোরবাগানে আহতদের হাতে পাঁচ লক্ষ টাকা করে তুলে দেওয়ার কথা জানিয়েছেন শুভেন্দু। আগামী বছরের পুজোয় যাতে এ ধরনের বিপর্যয় না ঘটে, সে বিষয়ে উদ্যোক্তাদের সতর্ক করার কথাও বলেছেন তিনি।

কলকাতার পুজো মণ্ডপগুলিতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখতে বিপর্যয় মোকাবিলা দপ্তরের প্রিন্সিপাল সচিব, দমকলের ডিজি এবং ডিজিএসটিএফের নেতৃত্বে একটি বিশেষ দল গঠনের কথা জানানো হয়েছে। দলটি মণ্ডপে গিয়ে প্রবেশ ও প্রস্থানের পথ, ভিড় নিয়ন্ত্রণ এবং অন্যান্য নিরাপত্তা ব্যবস্থার ত্রুটি পরীক্ষা করবে। কোনও সমস্যা চোখে পড়লে সংশ্লিষ্ট বিভাগের ডিসি ও স্থানীয় থানার ওসিকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের নির্দেশ দেওয়া হবে। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, এ ক্ষেত্রে কলকাতা পুলিশের কমিশনারের কাছে আলাদা করে সুপারিশ পাঠানোর প্রয়োজন হবে না। মণ্ডপে ভিআইপি লাইনের ব্যবস্থাও রাখা হবে না বলে জানিয়েছেন তিনি।

পুজো কমিটির পাশাপাশি স্থানীয় পুলিশের দায়িত্বও খতিয়ে দেখার কথা স্বীকার করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর মতে, আয়োজকদের ত্রুটি থাকলেও স্থানীয় পুলিশের নজরদারি থাকা উচিত ছিল। সেই কারণেই পুরসভা, পুলিশ ও দমকলের মতো লাইসেন্স প্রদানকারী সংস্থাগুলিকে বাদ রেখে বিচারপতির নেতৃত্বে একটি স্বাধীন তথ্য অনুসন্ধানকারী দল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি রবীন্দ্র ভি ঘুগের কাছে মুখ্যসচিব মনোজ অগ্রবাল চিঠি দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন তিনি। কর্মরত বিচারপতিকে পাওয়া না গেলে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে দল গঠনের কথাও ভাবা হচ্ছে। দলে স্বরাষ্ট্র দপ্তরের যুগ্মসচিব পদমর্যাদার আধিকারিক, ডিজিপির প্রতিনিধি হিসেবে একজন এডিজি এবং বিপর্যয় মোকাবিলা দপ্তরের প্রিন্সিপাল সচিব থাকবেন বলে প্রস্তাব করা হয়েছে।

এ দিকে চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গাপুজো কমিটির সঙ্গে যুক্ত কয়েক জন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের নাম সামনে আসায় বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছে। পুজো কমিটির প্রকাশিত পোস্টারে দেবদীপ অধিকারী, বিজেপি বিধায়ক বিজয় ওঝা এবং উত্তর কলকাতা জেলা বিজেপির সভাপতি তমোঘ্ন ঘোষের নাম থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। দেবদীপ অধিকারী মুখ্যমন্ত্রীর ভাইপো বলে পরিচিত। তবে তাঁদের কাউকে এই ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে পুলিশের তরফে স্পষ্ট করে কিছু জানানো হয়নি। এই প্রেক্ষাপটে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণ এবং দায়ীদের চিহ্নিত করতে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি আরও জোরালো হয়েছে।

Related posts

Leave a Comment