25 C
Kolkata
October 17, 2026
কলকাতা

চোরবাগানে পদপিষ্ট হয়ে মৃত ১৯, তদন্তের নির্দেশ মুখ্যমন্ত্রীর

আটক পুজো কমিটির ১২ সদস্য

সংবাদ কলকাতা: উত্তর কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গোৎসবের মণ্ডপে সপ্তমীর সন্ধ্যায় পদপিষ্টের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়ে ১৯ জনের মৃত্যু এবং ২৫ জনের আহত হওয়ার খবর সামনে এসেছে। শনিবার রাতে হাসপাতালে পৌঁছে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। মৃতদের পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দেওয়ার পাশাপাশি ঘটনার পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধানের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। পুজো কমিটির সদস্যদের থানায় ডেকে জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশও দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। পুলিশ ইতিমধ্যেই কমিটির ১২ জন সদস্যকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করছে বলে জানা গিয়েছে।

কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ সূত্রে খবর, আহতদের ইমার্জেন্সি অবজারভেশন ওয়ার্ডে রেখে চিকিৎসা চলছে। তাঁদের মধ্যে ১১ জনকে এসএসকেএম হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। কয়েক জনের আঘাত গুরুতর বলে খবর। আহতদের চিকিৎসার পাশাপাশি দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখতে শুরু করেছে প্রশাসন। ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হবে বলেও জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। পুজোর দায়িত্বে কারা ছিলেন এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনও গাফিলতি ছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখা হবে।

সরকারের তরফে একটি টোল-ফ্রি হেল্পলাইনও চালু করা হয়েছে। নম্বর ১৮০০৩৪৫৫৬৭৮। দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে রাজ্য সরকার।

বৃষ্টির মধ্যে ভিড়, কীভাবে ঘটল বিপত্তি?
সপ্তমীর সন্ধ্যায় উত্তর ও মধ্য কলকাতার বিভিন্ন এলাকায় প্রবল বৃষ্টি শুরু হয়। সেই সময় চোরবাগানের পুজোমণ্ডপে ঠাকুর দেখতে দর্শনার্থীদের ভিড় উপচে পড়েছিল। বৃষ্টি থেকে বাঁচতে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা বহু মানুষ মণ্ডপের ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের একাংশের দাবি। এর পরেই ভিড়ের মধ্যে ঠেলাঠেলি ও হুড়োহুড়ি শুরু হয়। কয়েক জন মাটিতে পড়ে যান। তাঁদের উপর দিয়ে অন্য দর্শনার্থীরা এগোনোর চেষ্টা করায় পদপিষ্টের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয় বলে প্রাথমিক ভাবে জানা যাচ্ছে।

মণ্ডপের ভিতরে একটি বৃত্তাকার ‘এলিভেটেড করিডর’ তৈরি করা হয়েছিল। দর্শনার্থীদের ওই পথ দিয়ে ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরে মণ্ডপ থেকে বেরোতে হচ্ছিল। প্রাথমিক সূত্রের দাবি, ওই করিডরেই বিপত্তি ঘটে। উদ্ধারকারীদের বক্তব্য, আহতদের মধ্যে কয়েক জনকে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীদের একাংশের অভিযোগ, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলেও সময়মতো পুলিশ বা নিরাপত্তারক্ষীদের দেখা মেলেনি। সাহায্য চেয়েও দ্রুত সহায়তা পাওয়া যায়নি বলেও অভিযোগ উঠেছে। তবে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং উদ্ধারকাজে কোনও গাফিলতি ছিল কি না, তা তদন্তের পরই স্পষ্ট হবে।

উদ্ধারকাজে জোর, হাসপাতালে পুলিশ কমিশনার
দুর্ঘটনার খবর পেয়েই ঘটনাস্থলে পৌঁছয় পুলিশ ও দমকলের বাহিনী। আহতদের দ্রুত হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। শনিবার রাতে কলকাতা পুলিশের কমিশনার অজয় নন্দও কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে পৌঁছে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেন। অন্যদিকে, চোরবাগান পুজোমণ্ডপের আলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। মণ্ডপের প্রবেশ ও বাহিরপথও বন্ধ রাখা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।

পুজোর উদ্যোক্তা বিকাশ দাস জানিয়েছেন, কীভাবে এমন পরিস্থিতি তৈরি হল, তা এখনও তাঁদের কাছে স্পষ্ট নয়। আপাতত আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানোই তাঁদের প্রধান কাজ। পুলিশ ও দমকলের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকাজে সহযোগিতা করছেন বলেও জানান তিনি। তাঁর কথায়, ‘আহতদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়াই আমাদের প্রাথমিক কাজ। ভিড়ের চাপে পদপিষ্ট কি না, স্পষ্ট নয়।’

পুজো কমিটির সদস্যদের ভূমিকা খতিয়ে দেখছে পুলিশ
চোরবাগান পুজোর সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন দেবদীপ অধিকারী, যিনি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ভাইপো। জোড়াসাঁকোর বিজেপি বিধায়ক বিজয় ওঝা এই পুজো কমিটির চেয়ারম্যান। উত্তর কলকাতা জেলা বিজেপির সভাপতি তমোঘ্ন ঘোষও পুজোর সঙ্গে যুক্ত। এই প্রেক্ষাপটে পুজোর আয়োজন, ভিড় নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তার দায়িত্বে কারা ছিলেন, তা তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, ঘটনার অনুসন্ধান করা হবে এবং দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হবে। সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করে দুর্ঘটনার আগে ও পরে কী ঘটেছিল, তা জানার চেষ্টা করবে পুলিশ। পুজো কমিটির সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করে ভিড় সামলানোর পরিকল্পনা, প্রবেশ ও বেরোনোর ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপত্তার দায়িত্ব সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হবে।

‘অরব’ ভাবনার মণ্ডপেই বিপত্তি
চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গোৎসব সমিতির ২০২৬ সালের পুজোর ভাবনা ছিল ‘অরব’, যার ইংরেজি তর্জমা ‘বিয়ন্ড সাউন্ড’। শব্দের পরিচিত গণ্ডি পেরিয়ে নীরবতার গভীরে পৌঁছনোর ভাবনাকে কেন্দ্র করে মণ্ডপ সাজানো হয়েছিল। ৩৬০ ডিগ্রির পরিকল্পনায় তৈরি এই মণ্ডপ দর্শনার্থীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠেছিল। সেরার সেরা পুজোর তালিকাতেও এই পুজো তৃতীয় স্থানে ছিল বলে জানা গিয়েছে।

তবে মণ্ডপের এই বিশেষ নকশা দর্শনার্থীদের চলাচলে কোনও সমস্যা তৈরি করেছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বৃষ্টির মধ্যে অতিরিক্ত ভিড়, প্রবেশ ও বেরোনোর পথের বিন্যাস এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে কোনও সমন্বয়ের অভাব ছিল কি না, তদন্তে সেই প্রশ্নগুলির উত্তর খোঁজা হবে।

উৎসবের আনন্দের মধ্যে এই মর্মান্তিক ঘটনা কলকাতার বড় পুজোগুলিতে ভিড় নিয়ন্ত্রণ ও দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। মৃতদের পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। এখন তদন্তের মাধ্যমে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণ এবং কোনও গাফিলতি থাকলে দায়ীদের চিহ্নিত করাই প্রশাসনের সামনে প্রধান কাজ।

Related posts

Leave a Comment