October 11, 2026
রাজ্য

শিলিগুড়িতে ‘হিন্দুর দোকান থেকে মাংস কিনুন’ পোস্টার ঘিরে বিতর্ক

নিজস্ব সংবাদদাতা, শিলিগুড়ি— ‘বিরিয়ানি খান, কিন্তু হিন্দুর হোটেল থেকে’ কিংবা ‘হিন্দুর দোকান থেকে মাংস কিনুন’— এমনই বার্তা লেখা পোস্টার ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হল শিলিগুড়িতে। মহালয়ার পরদিন শহরের ভারতনগর এলাকায় রাজ্যের পর্যটনমন্ত্রী শঙ্কর ঘোষের বাড়ির সামনে এবং আশপাশের বিভিন্ন দেওয়ালে এই পোস্টার দেখা যায়। তরুণতীর্থ ক্লাবের পুজো ময়দানেও একই ধরনের পোস্টার লাগানো হয়েছে। পোস্টারগুলির নীচে রয়েছে হিন্দু জাগরণ মঞ্চের নাম।

পুজোর আগে আমিষ খাবার বিক্রি ও খাওয়াকে কেন্দ্র করে বিতর্কের আবহে এই পোস্টার নতুন করে রাজনৈতিক তরজা উসকে দিয়েছে। পোস্টারে একদিকে হিন্দুদের দোকান থেকে মাংস কেনার আহ্বান জানানো হয়েছে, অন্যদিকে বিরিয়ানি খাওয়ার ক্ষেত্রে কোনও নিষেধাজ্ঞা নেই বলে উল্লেখ করে হিন্দুদের পরিচালিত হোটেল থেকে তা কেনার বার্তা দেওয়া হয়েছে।

হিন্দু ঐক্যের বার্তা, দাবি সংগঠনের

পোস্টার লাগানোর কথা স্বীকার করেছে হিন্দু জাগরণ মঞ্চ। সংগঠনের শিলিগুড়ির নেতা অভিষেক দাসের দাবি, শুধু ভারতনগর নয়, শহরের বিভিন্ন পুজোমণ্ডপের সামনেও এই পোস্টার লাগানো হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, হিন্দুদের ঐক্যবদ্ধ করার পাশাপাশি নেশামুক্তির বার্তাও দেওয়া হচ্ছে। সংগঠনের দাবি, এই প্রচারের উদ্দেশ্য হিন্দু ঐক্যের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া।

তবে পুজোমণ্ডপের সামনে এমন পোস্টার লাগানো নিয়ে আপত্তি তুলেছে বিরোধী শিবির। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ সফরে এসে ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রী, যিনি বাগেশ্বর বাবা নামে পরিচিত, প্রতিমার পাশে আমিষ বিক্রি নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন। সেই মন্তব্য ঘিরেও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। তার পর শিলিগুড়ির এই পোস্টারকে কেন্দ্র করে আমিষ খাবার, ধর্মীয় পরিচয় এবং ব্যবসার স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা নতুন মাত্রা পেয়েছে।

শঙ্কর ঘোষের বক্তব্য, পোস্টার কারা লাগিয়েছে জানি না

রাজ্যের পর্যটনমন্ত্রী তথা শিলিগুড়ির বিধায়ক শঙ্কর ঘোষ জানিয়েছেন, কে বা কারা এই পোস্টার লাগিয়েছে, সে বিষয়ে তাঁর কিছু জানা নেই। তাঁর বক্তব্য, যাঁরা পোস্টার লাগিয়েছেন, তাঁরাই এই বিষয়ে বলতে পারবেন।

মন্ত্রী নিজে পোস্টার লাগানোর সঙ্গে কোনও যোগ থাকার কথা জানাননি। ফলে তাঁর বাড়ির সামনে পোস্টার দেখা গেলেও বিষয়টি নিয়ে তাঁর অবস্থান আপাতত এই বক্তব্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।

বিজেপিকে নিশানা অশোক ভট্টাচার্যের

শিলিগুড়ির প্রাক্তন মেয়র তথা প্রাক্তন মন্ত্রী ও সিপিএম নেতা অশোক ভট্টাচার্য এই পোস্টারকে পরিকল্পিত প্রচারকৌশল বলে দাবি করেছেন। তাঁর অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের দ্বারা পরিচালিত এবং বিজেপির মতাদর্শের সঙ্গে যুক্ত। তাঁর মতে, খাবার কেনা বা খাওয়ার মতো ব্যক্তিগত বিষয়েও ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নির্দেশ দেওয়ার প্রবণতা সমাজে বিভাজন তৈরি করতে পারে।

অশোক ভট্টাচার্য আরও দাবি করেছেন, রাজ্যের রাজনৈতিক পরিবেশের কারণে এ ধরনের সংগঠন উৎসাহ পাচ্ছে। একই সঙ্গে শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখতে পুলিশকে উদ্যোগী হওয়ার আবেদন জানিয়েছেন তিনি।

গৌতম দেবের প্রতিক্রিয়া

শহরের আর এক প্রাক্তন মেয়র তথা রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী ও তৃণমূল নেতা গৌতম দেবও পোস্টার নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, ভারত ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। পুজোর ঠিক আগে এই ধরনের প্রচার সংবিধানের ভাবনার পরিপন্থী বলে তিনি মনে করেন। বিষয়টি নিয়ে পুলিশ যথাযথ পদক্ষেপ করবে বলেও আশা প্রকাশ করেছেন তিনি।

সব মিলিয়ে, শিলিগুড়িতে হিন্দু জাগরণ মঞ্চের পোস্টারকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় পরিচয়, খাদ্যাভ্যাস এবং ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের পরিচিতি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। সংগঠনটি যেখানে হিন্দু ঐক্যের প্রচার বলে দাবি করছে, সেখানে বিরোধীদের বক্তব্য, এ ধরনের প্রচার সামাজিক সম্প্রীতির উপর প্রভাব ফেলতে পারে। এই পরিস্থিতিতে প্রশাসনের ভূমিকা এবং শহরে শান্তি বজায় রাখার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

Related posts

Leave a Comment