33 C
Kolkata
October 5, 2026
দেশ

উৎসবের মরসুমে হকার উচ্ছেদ নয়, রাজ্যগুলিকে বার্তা মানবাধিকার কমিশনের

দিল্লি: উৎসবের মরসুমে রাস্তার ধারের হকার, স্থানীয় বিক্রেতা, মৃৎশিল্পী এবং ছোট ব্যবসায়ীদের অকারণে উচ্ছেদ করা যাবে না। তাঁদের জীবন-জীবিকা ও মানবাধিকার যাতে সুরক্ষিত থাকে, তা নিশ্চিত করতে দেশের সব রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলকে পরামর্শ দিল জাতীয় মানবাধিকার কমিশন।

নবরাত্রি, দুর্গাপুজো, দীপাবলি এবং ছটপুজোকে সামনে রেখে এই নির্দেশমূলক পরামর্শ দিয়েছে কমিশন। উৎসবের সময়ে ব্যবসা-বাণিজ্যকে ঘিরে সাধারণ মানুষের ভিড় বাড়ে। একই সঙ্গে রাস্তার ধারে অস্থায়ী দোকান, হকারি এবং ছোট ব্যবসার উপরেও নির্ভরশীল বহু মানুষের আয়-রোজগার বেড়ে যায়। সেই পরিস্থিতিতে প্রশাসনিক পদক্ষেপের নামে তাঁদের যাতে হঠাৎ করে জীবিকা থেকে বঞ্চিত হতে না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক করেছে কমিশন।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের তরফে দেশের সমস্ত রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মুখ্যসচিবদের কাছে এই বার্তা পাঠানো হয়েছে। শুধু রাজ্য প্রশাসনেই নয়, জেলাশাসক, পুরসভা বা পুর কর্তৃপক্ষ, পুলিশ এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রশাসনিক স্তরেও এই নির্দেশের বিষয়টি পৌঁছে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

কমিশন জানিয়েছে, উৎসবের মরসুমে কোনও হকার বা ছোট ব্যবসায়ীকে যেন অকারণে রাস্তা বা ব্যবসার জায়গা থেকে সরিয়ে দেওয়া না হয়। বিশেষ করে ফুটপাথ, রাস্তার ধারে বা বাজার এলাকায় যাঁরা অস্থায়ী ভাবে ব্যবসা করেন, তাঁদের জীবিকা যাতে প্রশাসনিক অভিযানের কারণে আচমকা বন্ধ হয়ে না যায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

গত বছরও উঠেছিল অভিযোগ
হকার ও ছোট ব্যবসায়ীদের নিয়ে এই ধরনের অভিযোগ অবশ্য নতুন নয়। গত বছরও দেশের বিভিন্ন শহর থেকে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কাছে অভিযোগ পৌঁছেছিল। অভিযোগ ছিল, উৎসবের সময়ে রাস্তার ধারের হকার ও স্থানীয় ছোট ব্যবসায়ীদের অকারণে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। কোথাও তাঁদের দোকান সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, কোথাও আবার ব্যবসার সামগ্রী বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি জরিমানা এবং প্রশাসনিক হয়রানির অভিযোগও উঠেছিল।

এই অভিযোগগুলির পরিপ্রেক্ষিতে গত বছর জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের একটি বেঞ্চ বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের পরামর্শ দিয়েছিল। কমিশনের সদস্য প্রিয়ঙ্ক কানুনগোর নেতৃত্বে ওই বেঞ্চ সংশ্লিষ্ট রাজ্য এবং স্থানীয় প্রশাসনকে অভিযোগগুলি গুরুত্ব দিয়ে দেখার কথা জানিয়েছিল।

এ বারও সেই অভিজ্ঞতার কথা মাথায় রেখেই উৎসবের মরসুম শুরুর আগে রাজ্যগুলিকে সতর্ক করেছে কমিশন। তাদের বক্তব্য, আইনশৃঙ্খলা বা জননিরাপত্তার প্রয়োজন থাকলে প্রশাসন অবশ্যই ব্যবস্থা নিতে পারে। কিন্তু সেই ব্যবস্থা যেন হকার ও ছোট ব্যবসায়ীদের জীবন-জীবিকার উপর অযথা আঘাত না করে।

নিরাপত্তার প্রয়োজনে উচ্ছেদ হলে বিকল্প জায়গা দিতে হবে
কোনও এলাকায় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা, যান চলাচল বা অন্য কোনও গুরুত্বপূর্ণ কারণে জায়গা খালি করার প্রয়োজন হলে বিক্রেতাদের জন্য উপযুক্ত বিকল্প জায়গার ব্যবস্থা করার কথাও বলেছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন।

অর্থাৎ, কোনও হকারকে শুধু সরিয়ে দিলেই প্রশাসনের দায়িত্ব শেষ হবে না। তাঁর ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার জন্য পরিস্থিতি অনুযায়ী বিকল্প ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের পণ্য বা সামগ্রী যেন ইচ্ছামতো বাজেয়াপ্ত করা না হয়, সেই বিষয়েও প্রশাসনকে নজর দিতে বলা হয়েছে।

১৮ অক্টোবরের মধ্যে রিপোর্ট
রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলিকে শুধু পরামর্শ দিয়েই থামেনি কমিশন। এই বিষয়ে তারা কী পদক্ষেপ করছে, সে সম্পর্কে রিপোর্টও চাওয়া হয়েছে। আগামী ১৮ অক্টোবরের মধ্যে সংশ্লিষ্ট রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলিকে নিজেদের পদক্ষেপের রিপোর্ট জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কাছে জমা দিতে বলা হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গেও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের এই পরামর্শের তাৎপর্য পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রেও যথেষ্ট বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহলের একাংশ। কারণ, সাম্প্রতিক সময়ে রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাথ, রেলের জমি এবং সরকারি জমিতে বেআইনি ভাবে চলা ব্যবসা ও দখলের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক অভিযান হয়েছে। কোথাও দোকান সরানো হয়েছে, কোথাও উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে উৎসবের মরসুমে হকার ও ছোট ব্যবসায়ীদের বিষয়ে কমিশনের অবস্থান প্রশাসনের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবেই দেখা হচ্ছে। একদিকে জননিরাপত্তা, যান চলাচল ও সরকারি জমি দখলমুক্ত রাখার মতো বিষয় রয়েছে, অন্যদিকে রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে এই ব্যবসার উপর নির্ভরশীল মানুষের জীবন-জীবিকা।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের বক্তব্য, প্রশাসনিক পদক্ষেপের ক্ষেত্রে এই দুই দিকের মধ্যে ভারসাম্য রাখা জরুরি। উৎসবের সময়ে আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি হকার, মৃৎশিল্পী, স্থানীয় বিক্রেতা এবং ছোট ব্যবসায়ীদের মানবাধিকার ও জীবিকার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।

Related posts

Leave a Comment