September 6, 2026
রাজ্য

উত্তর সিকিমে ভয়াবহ ধস, তিস্তার উপনদীর জলপ্রবাহে বাধা; মালবাজারে সরানো হল বাসিন্দাদের

নিজস্ব সংবাদদাতা, জলপাইগুড়ি—অবিরাম বৃষ্টিতে তিস্তা ফুঁসছে। তার মধ্যেই উত্তর সিকিমের নাগা বনাঞ্চলের থেং টানেল সংলগ্ন এলাকায় বড়সড় ধস নামায় তিস্তার উপনদী চেকুং নদীর একাংশে জলপ্রবাহ বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে। ধসের জেরে নদীতে পাথর, মাটি ও পাহাড়ি ধসের ধ্বংসাবশেষ জমে যাওয়ায় ঘোলা-কাদা জল নেমে আসছে। পরিস্থিতি ঘিরে আতঙ্ক ছড়িয়েছে স্থানীয় এলাকায়। ইতিমধ্যেই সতর্কতামূলক নির্দেশিকা জারি করেছে প্রশাসন। তিস্তা তীরবর্তী মালবাজার মহকুমার একাধিক এলাকা থেকেও ঝুঁকিপূর্ণ বাসিন্দাদের নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়া শুরু হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, থেং টানেল সংলগ্ন এলাকায় পাহাড়ের বড় অংশ ধসে পড়ায় চেকুং নদীর বিস্তীর্ণ অংশে পাথর ও মাটি জমেছে। এর ফলে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ধসের জেরে ঘোলা জল নেমে আসছে নদীতে। থেং টানেলের বিপরীত দিকে তিস্তা ও চেকুং নদীর সঙ্গমস্থলেও প্রচুর পাথর-মাটি জমে জলপ্রবাহ আংশিক আটকে গিয়েছে বলে খবর।


পাহাড় কেটে তৈরি থেং টানেল উত্তর সিকিমের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ এলাকার মধ্যে যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম। ধসের পাশাপাশি নাগা বনাঞ্চলের নাগা-তোসা সড়কের নতুন কাটা পাহাড়ি রাস্তার একটি বড় অংশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। পরিস্থিতির দিকে নজর রাখতে মঙ্গন ও চুংথাঙ প্রশাসন যৌথ ভাবে নজরদারি চালাচ্ছে।

প্রশাসনের তরফে অবশ্য জানানো হয়েছে, এই মুহূর্তে তিস্তার মূল প্রবাহ স্বাভাবিক রয়েছে। চেকুং নদীরও একটি অংশ খোলা থাকায় সেখান দিয়ে জল বেরিয়ে যাচ্ছে। তবে ধসের কারণে নদীর মোট কতটা অংশ অবরুদ্ধ হয়েছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। বৃষ্টির পরিমাণ আরও বাড়লে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

মঙ্গন জেলা প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, সঙ্কলং ও ফিদাঙ এলাকায় তিস্তার পরিস্থিতি আপাতত স্বাভাবিক। তবে ওই এলাকাতেও নিয়মিত নজরদারি চালানো হচ্ছে। সাধারণ মানুষকে নদীর গতিপথে কোনও অস্বাভাবিকতা চোখে পড়লে দ্রুত প্রশাসনের কন্ট্রোল রুমে খবর দিতে বলা হয়েছে। পাহাড়ি নিচু এলাকা এবং নদীসংলগ্ন ঝুঁকিপূর্ণ জনপদগুলিকে বিশেষ ভাবে সতর্ক থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এখনও পর্যন্ত উত্তর সিকিমে এই ঘটনায় প্রাণহানি বা আহত হওয়ার খবর নেই। ধসের কারণে পরিকাঠামো বা সম্পত্তির কতটা ক্ষতি হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

অন্য দিকে, তিস্তা তীরবর্তী মালবাজার মহকুমাতেও সতর্কতা বাড়ানো হয়েছে। বাসুসুবা, গজলডোবা, বাগরাকোট-সহ বিভিন্ন এলাকায় মাইকিং করে স্থানীয় বাসিন্দাদের সতর্ক করা হচ্ছে। পরিস্থিতির অবনতি হলে দ্রুত নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়ার জন্য শেল্টার হাউস প্রস্তুত রাখা হয়েছে।


ক্রান্তি ব্লকের চ্যাংমারি গ্রাম পঞ্চায়েতের সাহেববাড়ি এলাকায় নদীর চরে বসবাসকারী কয়েকটি পরিবারকে ইতিমধ্যেই উঁচু ও নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বাগরাকোট গ্রাম পঞ্চায়েতের টোটগাঁও এলাকার বাসিন্দাদেরও শেল্টার হাউসে সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। প্রশাসনের তরফে নদীর গতিপথ ও জলস্তরের উপর লাগাতার নজর রাখা হচ্ছে।

পর্যটন মহলের পক্ষ থেকেও পরিস্থিতির উপর নজর রাখা হচ্ছে। কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রির উত্তরবঙ্গ অঞ্চলের পর্যটন প্যানেলের চেয়ারম্যান সম্রাট সান্যাল জানিয়েছেন, সিকিম প্রশাসনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। তাঁর দাবি, প্রশাসন পরিস্থিতি মোকাবিলায় তৎপর রয়েছে। এখনও পর্যন্ত কোনও পর্যটক আটকে পড়ার খবর নেই বলেও জানিয়েছেন তিনি।

তিস্তা অববাহিকায় একদিকে অবিরাম বৃষ্টি, অন্য দিকে পাহাড়ে একের পর এক ধস—এই জোড়া পরিস্থিতিতে উত্তর সিকিম থেকে মালবাজার পর্যন্ত নদীতীরবর্তী এলাকায় উদ্বেগ বাড়ছে। প্রশাসনের নজর এখন বৃষ্টির গতিপ্রকৃতি, নদীর জলস্তর এবং ধসে অবরুদ্ধ চেকুং নদীর জলপ্রবাহের দিকে।

Related posts

Leave a Comment