August 25, 2026
রাজ্য

এসআইআর নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে বড় প্রশ্ন, ৩৮ লক্ষ আপিলের মধ্যে নিষ্পত্তি মাত্র ৮৩ হাজার

সংবাদ কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর নিয়ে মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টে গুরুত্বপূর্ণ শুনানি হয়েছে। শুনানিতে উঠে এসেছে, রাজ্যের বিভিন্ন ট্রাইব্যুনালে এখনও পর্যন্ত প্রায় ৩৮ লক্ষ ১০ হাজার আপিল জমা পড়েছে। কিন্তু তার মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র প্রায় ৮৩ হাজারের। আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার কারণে যাঁরা আপিল করেছেন, তাঁদের সংখ্যা প্রায় ৭ লক্ষ। বাকি বিপুল সংখ্যক আবেদন এসেছে ভোটার তালিকায় নতুন করে নাম অন্তর্ভুক্তির বিরোধিতা-সহ অন্যান্য কারণে।

এই পরিসংখ্যান সামনে আসার পরই ভোটাধিকার হারানোর আশঙ্কায় থাকা মানুষদের আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তির প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী মন্তব্য করেন, কোনও ব্যক্তির নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ার অর্থ তাঁর ভোটাধিকার কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়া। তাই বাদ পড়া ভোটারদের করা আবেদনকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন বলে আদালতে মত উঠে আসে।

শুনানিতে প্রবীণ আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় ৩১টি বিধানসভা কেন্দ্রের তথ্য তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য, বেশ কিছু কেন্দ্রে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া মানুষের সংখ্যা সংশ্লিষ্ট আসনে জয়ের ব্যবধানের থেকেও বেশি। ফলে ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রভাব আগামী নির্বাচনগুলিতেও পড়তে পারে বলে তিনি আদালতের নজরে আনেন।

কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় আরও জানান, ট্রাইব্যুনালে কতগুলি আবেদন এখনও বিচারাধীন এবং কতগুলি ইতিমধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ্যে নেই। সামনে পুরসভা ও পঞ্চায়েত নির্বাচন থাকায় বাদ পড়া ভোটারদের আবেদন দ্রুত বিবেচনা করা জরুরি বলেও তিনি জানান।

এর পরেই প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত স্পষ্ট করেন, আদালত শুধু ৩১টি বিধানসভা কেন্দ্রের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখবে না। রাজ্যের সব কেন্দ্রের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করা হবে। আবেদনগুলি যাতে অযথা দীর্ঘদিন ঝুলে না থাকে, সে জন্য নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সেগুলির নিষ্পত্তির প্রয়োজনীয়তার কথাও আদালতের তরফে বলা হয়েছে।

শুনানিতে আরটিআই-এর মাধ্যমে পাওয়া তথ্যও আদালতের সামনে তুলে ধরা হয়। প্রবীণ আইনজীবী গোপাল শঙ্করনারায়ণ জানান, এখনও পর্যন্ত প্রায় ৮৩ হাজার আবেদনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে এবং প্রায় ৭৫ হাজার মানুষ ফের ভোটার তালিকায় জায়গা পেয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, ট্রাইব্যুনাল ব্যবস্থা না থাকলে এই মানুষদের একটি বড় অংশ ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হতে পারতেন।

জলপাইগুড়ির উদাহরণও আদালতে তুলে ধরা হয়। সেখানে ৬৬৫ জনের নাম ভোটার তালিকায় ফের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বলে জানানো হয়। এই পরিসংখ্যান দেখিয়ে বাদ পড়া ভোটারদের আবেদনের ক্ষেত্রে দ্রুত শুনানির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন আইনজীবীরা।

বাদ পড়া ভোটারদের প্রায় ৭ লক্ষ আবেদনকে আগে বিবেচনা করার দাবিও ওঠে। যুক্তি দেওয়া হয়, যাঁরা কোনও ব্যক্তির নাম ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির বিরোধিতা করছেন, তাঁদের জন্য আইনে অন্য আইনি প্রতিকারের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়া ব্যক্তির ক্ষেত্রে সরাসরি ভোটাধিকার হারানোর প্রশ্ন জড়িত। তাই তাঁদের আবেদনকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।

বিচারপতি বাগচীর মন্তব্যেও সেই বিষয়টির গুরুত্ব স্পষ্ট হয়। তাঁর মতে, ভোটার তালিকা থেকে একজনের নাম বাদ যাওয়ার সঙ্গে তাঁর ভোটাধিকার হারানোর বিষয়টি সরাসরি যুক্ত। তাই বিপুল সংখ্যক আবেদনের মধ্যে কোন ধরনের আবেদন আগে শুনতে হবে, সেই অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা জরুরি।

নির্বাচন কমিশনের পক্ষে আইনজীবী নাইডু জানান, ট্রাইব্যুনালের সদস্যদের সঙ্গে ইতিমধ্যে বৈঠক হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত ট্রাইব্যুনালের প্রয়োজন রয়েছে বলেও তিনি জানান। এর পর আদালত জানতে চায়, যুক্তিসঙ্গত সময়ের মধ্যে সমস্ত আবেদন নিষ্পত্তি করতে ঠিক কতগুলি অতিরিক্ত ট্রাইব্যুনাল প্রয়োজন হবে।

শুনানিতে কলকাতা ও হাওড়ার সম্ভাব্য পুরসভা নির্বাচন নিয়েও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ডিসেম্বরে ওই দুই পুরসভার নির্বাচন হতে পারে বলে আদালতে আলোচনা হয়। সেই কারণে এই দুই এলাকার বাদ পড়া ভোটারদের আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তি করার দাবি সামনে আসে। গোপাল শঙ্করনারায়ণ প্রস্তাব দেন, প্রায় ৭ লক্ষ আবেদনের মধ্যে কলকাতা ও হাওড়া এলাকার আবেদনগুলিকে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে।

শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচন কমিশনের কাছে বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে। কতগুলি আবেদন এখনও ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন, কতগুলি নিষ্পত্তি হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব দিতে হবে। একই সঙ্গে বাদ পড়া ভোটারদের আবেদন কতগুলি, নতুন করে নাম অন্তর্ভুক্তির বিরোধিতা সংক্রান্ত আবেদন কতগুলি এবং ক্রস-আপিলের সংখ্যা কত, সেই তথ্যও আলাদা করে জানাতে হবে।

এর পাশাপাশি দ্রুত শুনানি শেষ করতে অতিরিক্ত কতগুলি ট্রাইব্যুনাল প্রয়োজন হতে পারে, সেই হিসাবও কমিশনকে জানাতে হবে। ফলে এসআইআর-এর পর ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া মানুষের আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তির বিষয়টি এখন শীর্ষ আদালতের নজরে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এসআইআর নিয়ে শুনানিতে বিভিন্ন আইনজীবী একাধিক সম্ভাব্য প্রভাবের কথা আদালতের সামনে তুলে ধরলেও প্রধান বিচারপতি জানান, আপাতত আদালত যে বিষয়গুলি সরাসরি সামনে রয়েছে, সেগুলির মধ্যেই শুনানি সীমাবদ্ধ রাখবে। তবে বিপুল সংখ্যক আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে আদালতের অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে। ফলে আগামী দিনে ভোটার তালিকায় নাম বাদ পড়া মানুষের আবেদনের শুনানি আরও দ্রুত করার প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।

Related posts

Leave a Comment