দিল্লি — বন্দে মাতরম্ বিতর্ককে ঘিরে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে আক্রমণ আরও তীব্র করল বিজেপি। রবিবার রাজস্থানের চিতৌরগড়ের সভা থেকে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সরাসরি কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধীকে নিশানা করেন। তাঁর অভিযোগ, কংগ্রেস সদর দপ্তরে বন্দে মাতরম্ পরিবেশনের সময় সোনিয়া গান্ধী গান থামানোর জন্য নির্দেশ দিচ্ছিলেন। এই ঘটনাকে ‘লজ্জাজনক’ বলে দাবি করে শাহ বলেন, দেশের মানুষ এই ঘটনা ক্ষমা করবে না।
একই দিনে কলকাতায় সাংবাদিক বৈঠক করে একই ইস্যুতে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে সরব হন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর হাতে ছিল বন্দে মাতরম্-এর স্রষ্টা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পরিবারের সদস্য সুমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা সোনিয়া গান্ধীর উদ্দেশে চিঠি। সেই চিঠির প্রসঙ্গ তুলে মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেন, বন্দে মাতরম্ নিয়ে কংগ্রেসের অবস্থান বাংলার মানুষের আবেগকে আঘাত করেছে।

বিতর্কের সূত্রপাত স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে। দিল্লিতে কংগ্রেসের ইন্দিরা ভবনে বন্দে মাতরম্ পরিবেশনের সময় সোনিয়া গান্ধীকে দলীয় কর্মীদের সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায় বলে দাবি বিজেপির। সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিয়োয় কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গে, লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী-সহ দলের অন্য নেতাদের বন্দে মাতরম্ পরিবেশনে অংশ নিতে দেখা যায়। সেই সময় সোনিয়া গান্ধীকে কয়েকটি নির্দেশ দিতে দেখা যায়।
তবে ওই ভিডিয়োর সত্যতা স্বাধীন ভাবে যাচাই করা হয়নি। বিজেপি ভিডিয়োটিকে সামনে রেখে অভিযোগ করে, সম্পূর্ণ বন্দে মাতরম্ পরিবেশনের সময় সোনিয়া গান্ধী অস্বস্তি প্রকাশ করেছিলেন এবং গান থামানোর চেষ্টা করেছিলেন। বিষয়টি নিয়ে শনিবার থেকেই কংগ্রেসের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আক্রমণ শুরু করে বিজেপি।
রবিবার সেই আক্রমণ আরও বাড়িয়ে দেন অমিত শাহ। চিতৌরগড়ের সভায় তিনি দাবি করেন, কংগ্রেসের সদর দপ্তরে বন্দে মাতরম্ গাওয়ার সময় সোনিয়া গান্ধী কংগ্রেস সভাপতিকে গান গাইতে বাধা দিয়েছিলেন। শাহের বক্তব্য, এই ঘটনা দেশবাসীর সামনে ঘটেছে এবং দেশের মানুষ তা দেখেছেন। সোনিয়া গান্ধীকে নিশানা করে তিনি বলেন, এই ঘটনা দেশবাসী ভুলবে না।
বিজেপির আক্রমণের পাশাপাশি বিষয়টি নিয়ে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পরিবারের পক্ষ থেকেও সোনিয়া গান্ধীকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। নৈহাটির বিজেপি বিধায়ক এবং বঙ্কিমচন্দ্রের পরিবারের সদস্য সুমিত্র চট্টোপাধ্যায় ওই চিঠিতে সোনিয়ার আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর অভিযোগ, কংগ্রেস কর্মীরা যখন বন্দে মাতরম্-এর পূর্ণাঙ্গ রূপ পরিবেশন করছিলেন, তখন সোনিয়ার শারীরিক ভাষায় অস্বস্তি এবং বিরক্তি প্রকাশ পেয়েছিল।

চিঠিতে সুমিত্র সোনিয়া গান্ধীকে বিষয়টি নিয়ে আত্মবিশ্লেষণ করার পাশাপাশি নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ার আবেদন জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, বন্দে মাতরম্ শুধু একটি গান নয়, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসের সঙ্গে গভীর ভাবে যুক্ত একটি জাতীয় আবেগের প্রতীক। তাই এই গানকে ঘিরে কোনও অবমাননাকর আচরণ হয়ে থাকলে তার ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
সেই চিঠিই সাংবাদিক বৈঠকে সামনে আনেন শুভেন্দু অধিকারী। তিনি বলেন, স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় বন্দে মাতরম্ বিপ্লবীদের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস ছিল। তাঁর দাবি, এই গানকে অপমান করা মানে দেশপ্রেমের ভাবনাকে আঘাত করা এবং বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সৃষ্টিকেও অসম্মান করা। বাংলার মাটি থেকে তিনি এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানান।
পাশাপাশি রাজ্যের কংগ্রেস নেতৃত্বকেও আক্রমণ করেন শুভেন্দু। তাঁর বক্তব্য, এই বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গের কংগ্রেস নেতৃত্বের কাছ থেকে খুব বেশি কিছু আশা করা যায় না। তবে সোনিয়া গান্ধীর কাছ থেকে স্পষ্ট প্রতিক্রিয়া আশা করেন তিনি।
বিজেপির এই অভিযোগ অবশ্য মানতে নারাজ কংগ্রেস। কংগ্রেসের দাবি, ইন্দিরা ভবনের অনুষ্ঠানে সম্পূর্ণ বন্দে মাতরম্ পরিবেশন করা হয়েছে। দলের সাধারণ সম্পাদক জয়রাম রমেশের বক্তব্য, অনুষ্ঠানের সময় মল্লিকার্জুন খড়্গে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁর জন্য একটি চেয়ার আনার নির্দেশই সোনিয়া গান্ধী দিচ্ছিলেন বলে কংগ্রেসের ব্যাখ্যা।
ফলে বন্দে মাতরম্ নিয়ে রাজনৈতিক সংঘাত এখন আরও তীব্র হয়েছে। বিজেপি বিষয়টিকে জাতীয়তাবোধ ও দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত করে কংগ্রেসকে আক্রমণ করছে। অন্য দিকে কংগ্রেস বলছে, বিজেপি একটি ভিডিয়োর দৃশ্যকে নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা করে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি করছে।

স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানের একটি দৃশ্যকে ঘিরে শুরু হওয়া এই বিতর্ক এখন বিজেপি বনাম কংগ্রেসের বড় রাজনৈতিক সংঘাতে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে বাংলার ঐতিহাসিক যোগ থাকায় রাজ্যেও বিষয়টি রাজনৈতিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আগামী দিনে সোনিয়া গান্ধী বা কংগ্রেসের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে নতুন কোনও ব্যাখ্যা আসে কি না, এখন সেদিকেই নজর থাকবে।
