July 17, 2026
রাজ্য

বৃষ্টিভেজা কলকাতায় ইসকনের রথযাত্রার সূচনা, রথের রশি টানলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী

সংবাদ কলকাতা: ধর্মীয় আবেগ, ভক্তির সুর আর ‘হরে কৃষ্ণ, হরে রাম’ মহামন্ত্রের ধ্বনিতে মুখর হয়ে উঠল কলকাতা। বৃহস্পতিবার ইসকনের ঐতিহ্যবাহী রথযাত্রার শুভ সূচনা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সকাল থেকেই অ্যালবার্ট রোডের ইসকন মন্দির চত্বর এবং রথযাত্রার নির্ধারিত পথে হাজার হাজার ভক্তের ঢল নামে। বৃষ্টির মাঝেও উৎসবের উন্মাদনায় কোনও ভাটা পড়েনি। মৃদঙ্গ, করতাল ও নামসংকীর্তনের সুরে আধ্যাত্মিক আবহে ভরে ওঠে গোটা এলাকা।

দুপুর প্রায় ১২টা নাগাদ ইসকন মন্দিরে পৌঁছে প্রথমেই শ্রীশ্রী জগন্নাথদেব, বলরাম ও সুভদ্রার বিগ্রহে প্রণাম জানান মুখ্যমন্ত্রী। পুজো ও আরতি করার পর তিনি ইসকনের প্রতিষ্ঠাতা আচার্য শ্রীল প্রভুপাদের কক্ষে গিয়ে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করেন এবং কক্ষটি পরিদর্শন করেন। পরে তিনি জানান, শ্রীল প্রভুপাদের এই ঐতিহাসিক কক্ষকে হেরিটেজ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে আবেদন জানানো হবে।

এরপর রথের সামনে এসে জগন্নাথদেব, বলরাম ও সুভদ্রার বিগ্রহে মাল্যদান করেন মুখ্যমন্ত্রী। উপস্থিত ভক্তদের অনুরোধে কয়েক কলি গৌড়ীয় ভক্তিমূলক সঙ্গীতও পরিবেশন করেন তিনি। প্রাচীন রীতি মেনে সোনার ঝাড়ু হাতে রথের পথ পরিষ্কার করার প্রতীকী আচার সম্পন্ন করেন। সেই আচার শেষ হওয়ার পরই আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় এ বছরের ইসকন রথযাত্রা। পরে তিনি রথের রশিতেও টান দেন এবং রথের সামনে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম জানান।

এ বছরের রথটি ফুল, আলোকসজ্জা এবং বর্ণিল সাজে বিশেষভাবে সজ্জিত করা হয়েছিল। রথ একবার দেখার জন্য রাস্তার দু’ধারে সকাল থেকেই ভিড় জমাতে শুরু করেন ভক্তরা। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলা ছাড়াও দেশের নানা প্রান্ত এবং বিদেশ থেকেও বহু ভক্ত এই রথযাত্রায় যোগ দেন। রথের সামনে কীর্তন, নৃত্য এবং নামসংকীর্তনে অংশ নেন হাজার হাজার মানুষ। শিশু থেকে প্রবীণ, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে বহু ভক্ত রথের দড়ি টেনে ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নেন। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, রথের দড়ি টানলে শুভফল ও পুণ্যলাভ হয়।

নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, অ্যালবার্ট রোড থেকে শুরু হয়ে রথযাত্রা হাঙ্গারফোর্ড স্ট্রিট, এজেসি বসু রোড, শরৎ বসু রোড, হাজরা রোড, শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি রোড, এক্সাইড মোড়, জওহরলাল নেহরু রোড এবং আউট্রাম রোড হয়ে ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে পৌঁছবে। গোটা রুটজুড়ে কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। মোতায়েন রয়েছে বিপুল সংখ্যক পুলিশকর্মী। যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিক পুলিশের বিশেষ ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।

রথযাত্রার মঞ্চ থেকেই রাজ্যের মিড-ডে মিল প্রকল্প নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, স্কুলপড়ুয়া শিশুদের পুষ্টিকর খাবার পৌঁছে দেওয়া সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত এবং আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারের ছাত্রছাত্রীদের জন্য উন্নত মানের খাদ্য নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর।

ইসকনের উদ্যোগের প্রশংসা করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, দেশের ২২টি বড় শহরে বহু বছর ধরে স্কুলের মিড-ডে মিল প্রকল্প সফলভাবে পরিচালনা করছে ইসকন। সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়েই পশ্চিমবঙ্গেও এই সংস্থার সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করবে রাজ্য সরকার। তাঁর দাবি, উন্নত পুষ্টিগুণসম্পন্ন খাবার শিশুদের কাছে পৌঁছে দিতে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে। একই সঙ্গে তিনি পূর্ববর্তী তৃণমূল সরকারের আমলে মিড-ডে মিল প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগও তোলেন।

মুখ্যমন্ত্রী আরও জানান, ভবিষ্যতে শুধু ইসকন নয়, রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন, ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘ-সহ বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় সমাজকল্যাণমূলক কর্মসূচি আরও বিস্তৃত করা হবে।

রথযাত্রা উপলক্ষে রাজ্যবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘শুভ রথযাত্রার পবিত্র তিথিতে শ্রীশ্রী জগন্নাথদেব, শ্রীশ্রী বলভদ্রদেব ও মাতা সুভদ্রা দেবীর চরণে শতকোটি প্রণাম। প্রভুর আশীর্বাদে সকলের জীবন সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধিতে ভরে উঠুক। দেশ, সমাজ এবং সমগ্র মানবজাতির কল্যাণ হোক— এই প্রার্থনাই করি। জয় জগন্নাথ।’

ইসকনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রথযাত্রা উপলক্ষে দিনভর প্রসাদ বিতরণ, ভজন-কীর্তন, ধর্মীয় আলোচনা এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। শান্তি, সম্প্রীতি এবং মানবকল্যাণের বার্তা ছড়িয়ে দিতেই প্রতি বছরের মতো এবারও এই রথযাত্রার আয়োজন করা হয়েছে।

কলকাতার অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব হিসেবে পরিচিত ইসকনের রথযাত্রায় প্রতি বছরই লক্ষাধিক মানুষের সমাগম হয়। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বৃষ্টিভেজা আবহাওয়া, ভক্তদের উচ্ছ্বাস, সুশৃঙ্খল আয়োজন এবং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর অংশগ্রহণে এ বছরের রথযাত্রা বিশেষ তাৎপর্য লাভ করেছে।

Related posts

Leave a Comment