আগামী ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজ্যজুড়ে কৃষকদের নিয়ে ধারাবাহিক সম্মেলনের আয়োজন শুরু করেছে ভারতীয় কিষাণ সঙ্ঘ। কৃষকদের অধিকার, সমস্যার সমাধান এবং দাবিদাওয়া তুলে ধরতেই বিভিন্ন জেলায় ‘কৃষক সম্মেলন’ করছে সংগঠনটি।
গত ৪ মার্চ ছিল ভারতীয় কিষাণ সঙ্ঘের প্রতিষ্ঠা দিবস। ১৯৭৯ সালে রাজস্থানের কোটা শহরে দত্তপন্থ বাপুরাও ঠেংরির হাত ধরে এই সর্বভারতীয় সংগঠনের প্রতিষ্ঠা হয়। সেই দিনকে স্মরণ করে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় প্রতিষ্ঠা দিবস পালন করা হয়েছে। বর্তমানে দেশের সমস্ত রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল মিলিয়ে এই সংগঠনের সদস্য সংখ্যা ৫০ লক্ষেরও বেশি বলে সংগঠন সূত্রে জানা গিয়েছে।
বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে কৃষকদের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে এবং বিভিন্ন দাবি সামনে আনতেই রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় সম্মেলন শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে নদিয়া জেলার রানাঘাট–১ ব্লকের তারাপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের সুরেশনগর গ্রাম এবং তেহট্ট–১ ব্লকের কুষ্টিয়া হাসপাতাল মাঠে কৃষক সম্মেলন হয়েছে। উত্তর ২৪ পরগণার বনগাঁ ব্লকের দিঘারী গ্রাম ও গাইঘাটা ব্লকের আমকোলা গ্রামেও এই সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে।
এছাড়াও পূর্ব বর্ধমান জেলার ভাতার ব্লকের বলগোনা সরস্বতী শিশু মন্দির এবং মঙ্গলকোট ব্লকের কৈচর গ্রামে কৃষকদের নিয়ে সভা হয়েছে। পশ্চিম মেদিনীপুরের নারায়ণগড় ব্লকের চাতুরিভারা গ্রামসহ রাজ্যের আরও কয়েকটি এলাকায় একই ধরনের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।
ভারতীয় কিষাণ সঙ্ঘের পশ্চিমবঙ্গ প্রান্তের প্রচার প্রমুখ এবং ‘ভারতীয় কিষাণ বার্তা’ পত্রিকার সম্পাদক মিলন খামারিয়া বলেন, ‘কৃষকদের উৎপাদিত ফসলের উপর নির্ভর করেই সমাজ বেঁচে আছে। কিন্তু সেই কৃষকরাই আর্থিক সাফল্য এবং সামাজিক সম্মান থেকে বঞ্চিত। নতুন প্রজন্মের মধ্যে চাষাবাদের প্রতি অনীহাও বাড়ছে। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে ভবিষ্যতে কৃষিকাজ করবে কে— সেই প্রশ্ন উঠছে।’
তার মতে, কৃষকদের অধিকার সম্পর্কে সমাজকে সচেতন করতেই এই সম্মেলনের আয়োজন করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে। কৃষকদের ন্যায্য অধিকার পাইয়ে দিতে সমাজের সব স্তরের মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। যে সরকার কৃষকদের প্রকৃত স্বার্থ রক্ষা করবে, সেই সরকারই মানুষ গড়ে তুলবে।’
সংগঠনের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক আশিস সরকার জানান, পশ্চিমবঙ্গের মোট ৩৪৬টি কৃষি ব্লকেই কৃষক সম্মেলন করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন জেলায় এই কর্মসূচি শুরু হয়েছে। তার কথায়, ‘কৃষকদের দাবিদাওয়া আদায় করে সমৃদ্ধ কৃষক সমাজ গড়ে তোলাই আমাদের মূল লক্ষ্য। পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষা করে জৈব পদ্ধতিতে চাষাবাদকে আবার জনপ্রিয় করে তোলার উপরও জোর দেওয়া হচ্ছে।’
ভারতীয় কিষাণ সঙ্ঘের রাজ্য সভাপতি অনিমেষ পাহাড়ি বলেন, দেশের কৃষকদের নেতৃত্বে অতীতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কৃষি বিপ্লব হয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে দুগ্ধ বিপ্লব, আলু ও গোলাকার সবজি উৎপাদনের বিপ্লব, টমেটো বিপ্লব, ডিম উৎপাদনের বিপ্লব, তেল বিপ্লব, সবুজ বিপ্লব, ফল-ফুল ও মধু উৎপাদনের বিপ্লব এবং মৎস্য বিপ্লব।
তার দাবি, এই সব ক্ষেত্রেই দেশের কৃষকেরাই মূল ভূমিকা পালন করেছেন এবং দেশের খাদ্য ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তবুও কৃষকরা আজও প্রাপ্য সামাজিক মর্যাদা ও আর্থিক সাফল্য পাননি। সেই কারণেই কৃষকদের দাবি আদায়ের জন্য ভারতীয় কিষাণ সঙ্ঘ নিরন্তর কাজ করে চলেছে।
সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আগামী বিধানসভা নির্বাচনের আগে কৃষকদের স্বার্থ রক্ষার প্রশ্নে সব রাজনৈতিক দলকেই স্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে। কৃষকরা শেষ পর্যন্ত তাদেরই সমর্থন করবেন, যারা কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় বাস্তব পদক্ষেপ নেবে— এমন বার্তাই এই সম্মেলনের মাধ্যমে তুলে ধরা হচ্ছে।
