ইসলামাবাদ, ২৪ জানুয়ারি: পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে এক বিয়ের অনুষ্ঠানে ভয়াবহ আত্মঘাতী বিস্ফোরণে অন্তত ছয় জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও এক ডজনের বেশি মানুষ। শুক্রবার গভীর রাতে ডেরা ইসমাইল খান জেলার একটি বাড়িতে চলা বিয়ের অনুষ্ঠানের মধ্যেই এই হামলার ঘটনা ঘটে, যা গোটা এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, শান্তি কমিটির প্রধান নূর আলম মেহসুদের বাড়িকেই লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়। বিস্ফোরণের সময় বাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠান চলছিল। আচমকা বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটতেই চারদিকে ছুটোছুটি শুরু হয়, আতঙ্কে চিৎকার করে ওঠেন উপস্থিত অতিথিরা। রক্তাক্ত অবস্থায় বহু মানুষ মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। আহতদের দ্রুত নিকটবর্তী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
পুলিশ ও প্রশাসন সূত্রে জানানো হয়েছে, প্রাথমিক তদন্তে এটি আত্মঘাতী হামলাই বলে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে। বিস্ফোরণের পর হামলাকারীরা গুলিবর্ষণও করে বলে জানা গিয়েছে। ঘটনাস্থলে দীর্ঘক্ষণ ধরে তদন্তকারী দল ও ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত থেকে নমুনা সংগ্রহ করেন এবং হামলার পেছনের চক্র শনাক্ত করার কাজ শুরু করেন।
নিরাপত্তা বাহিনীর দাবি, বিস্ফোরণস্থল থেকে এক কিশোর আত্মঘাতী হামলাকারীর বিচ্ছিন্ন মস্তক উদ্ধার করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, তার বয়স আনুমানিক সতেরো বছর। পরিচয় শনাক্তকরণের জন্য তা ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।
এই ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন শান্তি কমিটির প্রধান নূর আলম মেহসুদ নিজেও। তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে এবং চিকিৎসকরা তাঁর অবস্থা পর্যবেক্ষণে রেখেছেন।
খাইবার পাখতুনখোয়ার মুখ্যমন্ত্রী সোহাইল আফ্রিদি এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত রিপোর্ট তলব করেছেন। তিনি নির্দেশ দিয়েছেন, আহতদের সর্বোচ্চ চিকিৎসা পরিষেবা নিশ্চিত করতে হবে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘এই বর্বর হামলার জন্য যারা দায়ী, তাদের কাউকেই রেহাই দেওয়া হবে না। দোষীদের কঠোরতম শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।’
এই অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই সন্ত্রাসবাদী হামলার আতঙ্কে ভুগছে। আফগানিস্তান সীমান্তবর্তী খাইবার পাখতুনখোয়া ও বালোচিস্তান প্রদেশে সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক বিস্ফোরণ ও হামলার ঘটনা ঘটেছে। নিরাপত্তা পরিস্থিতি ক্রমশ উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
নূর আলম মেহসুদ এই প্রথম হামলার শিকার হননি। দুই হাজার বাইশ সালে তাঁর দপ্তরে আত্মঘাতী হামলার চেষ্টা হয়েছিল। সে সময় দুই হামলাকারী নিহত হয় এবং শান্তি কমিটির স্বেচ্ছাসেবকেরা হামলা প্রতিহত করতে সক্ষম হন। গত মাসেই ডেরা ইসমাইল খান এলাকায় পুলিশের একটি গাড়িতে বোমা হামলায় তিন জন পুলিশকর্মীর মৃত্যু হয়েছিল, যা গোটা প্রদেশে তীব্র আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করেছিল।
নিরাপত্তা গবেষণা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত বছরে পাকিস্তানে সামগ্রিক হিংসার ঘটনা পঁচিশ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। সাধারণ নাগরিক, নিরাপত্তা বাহিনী এবং অপরাধমূলক গোষ্ঠীর সংঘর্ষে মৃতের সংখ্যা তিন হাজারের বেশি ছুঁয়েছে, আহত প্রায় দুই হাজার মানুষ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল হিসেবে উঠে এসেছে খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশ।
এই আত্মঘাতী হামলা আবারও প্রমাণ করল, পাকিস্তানের বিস্তীর্ণ অংশে নিরাপত্তা পরিস্থিতি কতটা ভঙ্গুর এবং সাধারণ মানুষের জীবন কতটা অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। একদিকে সামাজিক অনুষ্ঠান, অন্যদিকে রক্তাক্ত সন্ত্রাস—এই দ্বন্দ্বেই আটকে রয়েছে বহু পরিবারের ভবিষ্যৎ।
