20 C
Kolkata
March 22, 2026
Featured

পদ্মশ্রী গুরু গম্ভীর সিং মুড়া ও পুরুলিয়ার ছৌ নৃত্য

 বাঘমুন্ডির রাজা মদনমোহনের আমল ছিল ছৌ নৃত্যের স্বর্ণযুগ।  তাঁর দরবারে বসেছে ছৌ নৃত্যের আসর। রাজা - পাত্র - মিত্র সবাই হাজির। দেখা নাই শিল্পীর। পুরুলিয়ার ছৌ ওস্তাদ জীপা সিং এর আসরে ছৌ এর কৌশল দেখানোর কথা। মুখোশ পরতে, পোশাক পরতে দেরী  হওয়ায় রাজা আসর  ছেড়ে চলে যায় এবং হুকুম জারি করেন জিপা যেন আজই তাঁর রাজ্য ছেড়ে চলে যায়। সেই রাত্রেই জিপা সিং সপরিবারে চড়দা গ্রাম ছেড়ে বামনী গ্রামের পিতিদিরি টোলায় চলে আসেন। এই জিপা সিং ও ফুলমনির কনিষ্ঠ সন্তান হল গুরু গম্ভীর সিং মুড়া।  পুরুলিয়ার ছৌ এবং গম্ভীর সিং এরা যেন একই দেহে দুইটি অঙ্গ। ওনার দাদু হারু সিংও ছৌ নৃত্যশিল্পী ছিলেন। পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড় এবং তৎসংলগ্ন জঙ্গল যেখানে বিভিন্ন পশু পক্ষীদের বাস সেখানেই গম্ভীর সিং মুড়ার  দিনের অর্ধেক সময় কাটে। ওদের সাথেই সখ্যতা। পশু পক্ষীদের চলন,বিভিন্ন ধরনের অঙ্গভঙ্গী নকল করতেন। গাছ থেকে বাঘ  কিভাবে লাফ দিয়ে মাটিতে থাকা শিকার ধরছে অথবা গরু শিং  উঁচিয়ে এলে শিং এ ভল্ট খাওয়া ইত্যাদি আরো নানা ধরনের ভঙ্গি সুক্ষভাবে অনুসরণ করতেন। ছৌ নৃত্যে আমরা দেবচাল, দানবচাল, পশুপাখির চাল দেখি, এছাড়া  ড্যাগ, ঘুরা, ডিগবাজি, উড়া ইত্যাদি দেখা যায় --- এগুলি সবই ছৌ নাচের আঙ্গিক। এগুলি গুরুজী নিজে রপ্ত করেছেন। প্রকৃতির কাছেই এসব শেখা। তাই তিনি বলেন প্রকৃতির কাছেই  তাঁর মূল শিক্ষা। যদিও ছৌ নৃত্যের ধারাবাহিকতা  ওনার রক্তে। 

    ১৯৩০সালে ব্রিটিশ ভারতের মানভূম জেলার অন্তর্গত অযোধ্যা পাহাড়ের কোলে বামনি গ্রামের টোলা পিতদিরিতে মামার বাড়িতে তাঁর জন্ম হয়। পিতা জীপা শিং খুব ভালো ছৌ নৃত্যের ওস্তাদ ছিলেন, কিন্তু অন্য দলের লোকেরা বিষ প্রয়োগে হত্যা করেছিল।  জন্মকালেই পিতৃহারা  হওয়ায় গুরুজীর বাল্যকাল  মোটেই মসৃণ ছিল না। পিতার মৃত্যুর পর আর্থিক অনটন দেখা দেয়। ওনার মা মূলত ভিক্ষা বৃত্তি করে ওনাকে বড়ো করে  তুলেছেন। মায়ের আর্থিক অভাব দূর করতে গরু বাগালির কাজ শুরু করেন। সেই থেকেই শুরু জঙ্গলে পশুপাখিদের  সঙ্গে সখ্যতা শুরু। বাঘমুন্ডির রাজা ক্ষেত্রমোহন সিং ছিলেন সংস্কৃতির  পৃষ্ঠপোষক। গাজন উৎসবে  রাজবাড়িতে বসেছে ছৌ নৃত্যের আসর। রাজার পার্ষদ গোলাম মহম্মদ খাঁর উদ্যোগে ১৪/১৫ বছরের বালক গম্ভীর রাজার সামনে প্রথম নৃত্য পরিবেশন করে। উপযুক্ত পোশাক ছিল না। মহম্মদ খাঁ পোশাকেরও বন্দোবস্ত করে দেন। রাজা মুগ্ধ হয়ে যান বালক গম্ভীর এর ছৌ নাচের দাপট দেখে। তারপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। নাচের দল তৈরি করে গ্রামে গ্রামে নৃত্য পরিবেশন করেছেন। এইরকম এক অনুষ্ঠানে স্যর আশুতোষ মুখোপাধ্যায় ওনার নাচ দেখে মুগ্ধ হন। পরবর্তীকালে আশুতোষ মুখোপাধ্যাযের  উদ্যোগে ছৌ নৃত্যের দল নিয়ে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, জাপান ইত্যাদি সফরে যান এবং প্রচুর সুখ্যাতি অর্জন করেন। রাষ্ট্রপতি জৈল সিংয়ের সময়ে "পদ্মশ্রী" উপাধী পান। 

গুরু গম্ভীর শিং মুড়া ও তাঁর ছৌ নৃত্যের সঙ্গে গৌড়ীয় নৃত্য  ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।  বাংলার যে সমস্ত লোকনৃত্যধারার উপর  গৌড়ীয় নৃত্যের ভিত্তি তৈরী হয়েছে তার মধ্যে অন্যতম ছৌ। গৌড়ীয় নৃত্যের জন্মদাত্রী  মহুয়া মুখোপাধ্যায় বাংলার শাস্ত্রীয় নৃত্যের পুনরুদ্ধার কার্যে বাংলার গ্রামাঞ্চলের লোকধারার অন্মেষণ করতে করতে ছৌএর সন্ধান পান এবং সেইসূত্রে গুরুজীর সান্নিধ্য লাভ করেন। গ্রামের গুরুরা সচরাচর শহরে আসতে চান না। তাছাড়া সেসময় মেয়েদের ছৌ শেখা এবং ছৌএর মুখোশ ধরা নিষিদ্ধ ছিল। এমতাবস্থায় গুরুজী কলকাতায় এসে মহুয়া মুখোপাধ্যায়ের বাড়িতে দু মাস থেকে ছৌ এর কর্মশালা করেন এবং পুরুলিয়ার মাটিতে কঠোর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে ছৌ এর অনুষ্ঠান করান। গুরু গম্ভীর শিং  নিজের খেয়ালে গ্রামের মাটিতে নাচ করেছেন, দেশ-বিদেশে অনুষ্ঠান করেছেন, কিন্তু কোনো নাচের যে একটি নির্দিষ্ট ব্যকরণ থাকে, সিলেবাস থাকে তা উনি জানতেন না। কারণ উনি তো প্রকৃতির কাছে ছৌ শিখেছেন কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নয়। কলকাতায় কর্মশালার পরে গুরুজীর নির্দেশে মহুয়া মুখোপাধ্যায়ের উদ্যোগে ছৌ এর সিলেবাস তৈরী হয় এবং তা  রবীন্দ্রভারতীতে পাঠ্যপুস্তকের অন্তর্ভুক্ত হয়। 

পুরুলিয়ার ছৌ নৃত্যে গম্ভীর শিং মুড়া এক এবং অদ্বিতীয়। প্রচুর সম্মান পেয়েছেন কিন্তু দারিদ্র্য পিছু ছাড়ে নি। এতেই উনি হতাশাগ্রস্ত এবং অভিমানী হয়ে পড়েছিলেন। তবুও শিল্পের জন্য কোনো আপোষ করেননি।বুক দিয়ে আগলে রেখেছিলেন সন্তানসম ছৌ নৃত্যকে। ২০০২ সালে ১০ই নভেম্বর গুরুজী ইহলোকের মায়া ত্যাগ করেন।
প্রণাম জানাই এই মহান ব্যক্তিত্বকে। এই মহান ব্যক্তির কথা বলতে গিয়ে তাঁর চর্চিত শিল্পকলাকে একটু বিস্তারিতভাবে দেখা যাক :

যে নৃত্য শাস্ত্রীয় ব্যাকরণভুক্ত নয়, কিন্তু স্বকীয় ঐতিহ্যে স্বত্ফূর্ত তাকে লোকনৃত্য বলে। 

ছৌ পূর্ব ভারতের এক বীরত্বব্যঞ্জক নৃত্য। বন পাহাড় ঘেরা ভূমিতে কৃষিজীবি মানুষের দ্বারা লালিত ছৌ নৃত্য। প্রাণোচ্ছল উদ্দীপনাময় এমন নৃত্যকলার জন্যই পুরুলিয়া, সেরাইকেল্লা ও ময়ূরভঞ্জ ভারতের সাংস্কৃতিক মঞ্চে নতুন মাত্রা গড়ে তুলেছে। পূর্ব ভারতে ছৌ নাচের একটি পরিমণ্ডল বহু পূর্বেই ছিল। সেই পরিমণ্ডলের মধ্যে বৃহদবঙ্গের বেশ কিছু অংশ ছিল। বাংলা ভাষা ও বাঙালির বিকাশের বিভিন্ন পর্বে বৃহদবঙ্গ বারে বারে খণ্ডিত হয়েছে ।ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক, ভৌগলিক এবং জনগোষ্ঠীর দিক থেকে তিন অঞ্চলের ছৌ নৃত্যের মধ্যে মিল খুঁজে পাওয়া যায়। ইতিহাসের পাতায় দেখা যায় একসময় সিংভূম জেলার পোড়াহাট ও সেরাইকেল্লার রাজপরিবার এবং ঝাড়গ্রামের চিল্কিগড় রাজ পরিবারের ও সিংভূম ও মানভূম (পুরুলিয়া) এই দুই রাজবংশের মধ্যে পারিবারিক সম্পর্ক ছিল। পরবর্তী সময়ে অঞ্চলগুলো একে অপরের থেকে পৃথক হয়ে যায়।
এই পর্যায়ে মূলত পুরুলিয়ার ছৌ নৃত্য বিষয়েই আলোচনা করা হবে। ছৌ নৃত্যের উদ্ভব সম্পর্কে ছৌ সম্রাট (গম্ভীর সিং মুড়া) বলেন “ছো নাচ মানে ছক দেখানো। কেউ যখন মারতে আসছে , ঢাল তলোয়ার আছে, আমাকে ছক করতে হবে। ছো নাচের মূল হল লড়াই। লড়াই ছাড়া ছো হয় না। মূল রস হল বীর রস। ছৌ নৃত্যের উৎস বা আদিমরূপ হল কাপঝাঁপ। শিব গাজনের সময় ভক্ত্যার দল মুখে রঙ কালি মেখে গায়ে ডাল পালা বেঁধে “গাদিন গাজা খাপ খাপ, গেদদা গাজা খাপ খাপ” —- এই তালে নাচত — এই হল কাপঝাঁপ। পুরুলিয়ার ছৌ নাচ গ্রাম বাংলার মাটিতে জন্ম নেওয়ার ফলে এই নৃত্যধারার মধ্যে গ্রামঞ্চলের সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির এক নিগূঢ় সম্পর্ক তৈরী হয়েছে। বাঘমুন্ডি , ঝলদা, বান্দয়ান, আরসা – এই চারটি আঞ্চলিক ধারাই এখানকার ছৌ নৃত্যে প্রধান। পুরুলিয়ার ছৌ নাচে একাধারে শাস্ত্রীয় নিয়মনীতি অপর দিকে জীবনের বিভিন্ন দিক ফুটে ওঠে। দেব, পশু ও মানুষ এই তিন ধরণের চাল দেখা যায়। প্রতিটি নৃত্যছকের মধ্যে “ডেগ” ও “চাল” অপরিহার্য। দেবচাল মাধুর্যপূর্ণ, দানবচাল তেজোপূর্ণ, পশুর চাল বিশেষ বিশেষ পশুর গতি প্রকৃতি অনুযায়ী। এছাড়া বিভিন্ন পাখীর চাল, মাছের শরীর মোচড় দেওয়ার ভঙ্গি ইত্যাদি এখানকার ছৌনৃত্যরীতির বৈশিষ্ট্য। আরো কিছু ভঙ্গি দেখা যায়, যেমন অভিজাত ভঙ্গি, উদ্ধত ভঙ্গি, হামাগুঁড়ি দেওয়া, হাঁটুমুড়ে মাটিতে বসা, স্বাভাবিকভাবে হেঁটে এগিয়ে যাওয়া – পিছিয়ে আসা, ঘুঙুরের শব্দ না করে পা টিপে শিকার অনুসরণ করা,হওয়ার গতিতে ঘোরা এবং মাটিতে বসে পড়ার ভঙ্গি এই অঞ্চলের ছৌ নৃত্যের বৈশিষ্ট্য। আর একটি উল্লেখযোগ্য ভঙ্গী হল “উলফা”– তালের গতিবৃদ্ধির সাথে চক্রাকারে ঘুরে ঘুরে লাফ দিয়ে চূড়ান্ত একটি গতি শিল্পীর মধ্যে প্রতিফলিত হয়। ছৌ নাচের আদিমরূপটি পুরুলিয়ার নাচে বর্তমান। প্রথমে শিল্পী মঞ্চে প্রবেশ করে এবং আক্রমণের ভাবটি ফুটিয়ে তুলে একটি স্থির ভঙ্গীতে দাঁড়ায়, তখন শিল্পীর মধ্যে সঞ্চিত শক্তির প্রতিফলন দেখতে পাওয়া যায়। শূন্যে লাফ দিয়ে হাঁটু মুড়ে বসার ভঙ্গীটির মধ্যে একটি মৌলিকত্ব আছে। প্রধান আকর্ষণ হল নাটকীয় উত্তেজনা। পুরুলিয়ার ছৌনাচের সঙ্গে যুক্ত কিছু আচার, বিশ্বাস ও সংস্কার। গনেশ বন্দনা দিয়ে মূলত পালা শুরু করে। রামায়ণ, মহাভারত ও অন্যান্য পুরাণ কাহিনী নির্ভর নৃত্য পালাগুলি পুরুলিয়ায় ছৌ নৃত্যে দেখা যায়। সর্বাধিক জনপ্রিয় পালাগুলি হল মহিষাসুরবধ, তারকাসুরবধ, মহীরাবণবধ, শুম্ভ নিশুম্ভ, কিরাত কিরাতিনি ইত্যাদি। মঞ্চে শুধু নৃত্য পরিবেশন করা হয় না। যন্ত্রসঙ্গীত ছৌ নাচের একটি অপরিহার্য অংশ। ঢোল, ধামসা, চড়চড়ি, টিকরা বা নাগরা, মাহুরি, সানাই, বাঁশি ইত্যাদি যন্ত্রসঙ্গীত বা বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার দেখা যায়। তবে বর্তমানে হারমোনিয়াম, করতাল, ঘণ্টা ইত্যাদিও ব্যবহৃত দেখা যায়। কণ্ঠসঙ্গীতের ব্যবহার দেখা যায়। পালার শুরুতেই গণেশ বন্দনার গানের কিছু অংশ ” প্রথমে বন্দনা করি গণেশ চরণ/ সিন্দুর বরণ অঙ্গ মুষিক বাহন”। আবার অভিমুন্য বধ পালায় দেখা যায় ” আর কোথায় ধর্ম যুধিষ্ঠির, কোথায় পার্থবীর/ কোথায় আমার ভীম বল বল হে,” । ( প্রচলিত ঝুমুর) । এই ধরণের গানের ব্যবহার দেখা যায়।
।পুরুলিয়ার ছৌ নাচ প্রথম পুরুলিয়ার বাইরে অনুষ্ঠান করে ১৯৫৩ সালে কলকাতার রাজভবনে। “স্টারস অব ইন্ডিয়া” শো তে। এরপর ১৯৫৪ সালে মহম্মদ আলি পার্কে বঙ্গসংস্কৃতি সম্মেলনে ছৌ নাচ দেখানোর সুযোগ হয়েছিল। ১৯৫৯ সালে বিশ্বযুব উৎসবে পুরুলিয়া ও মেদিনীপুরের ছৌ অনুষ্ঠিত হয়। পরবর্তীকালে দিল্লীর সঙ্গীত নাটক একাডেমী আয়োজিত বিভিন্ন সেমিনার ও নৃত্যানুষ্ঠান এর মধ্যে দিয়ে ছৌ নৃত্য জনপ্রিয়তা লাভ করে।

   পুরুলিয়ার ছৌ নৃত্য নিয়ে আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল এই নৃত্যের মুখোশ। আদিম মানুষ মুখোশের ব্যবহার শুরু করেছিল অদেখা শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক তৈরী উদ্দেশ্যে। বিশ্বাস যে, মুখোশের মধ্যে সমগ্রকে সীমায়িত করা যায়। আদিম গোষ্ঠীবদ্ধ সমাজে ধর্মীয় ও জাদুবিশ্বাসমূলক আচার পালনে মুখোশ ছিল অপরিহার্য। আদিম মানুষ পশুর মুখোশ পরে পশুর বিভিন্ন চাল ও গলার স্বর নকল করে দলছুট করতো ও বধ করতো। এছাড়া যুদ্ধের সময় মুখোশ কখনো বর্ম, আবার কখনো যুদ্ধের ঢাল হিসেবে ব্যবহার হতো।  পুরুলিয়ার ছৌ নৃত্যে যেহেতু ছৌ এর  আদিম রূপটি দেখা যায় তাই এখানে মুখোশেও  আদিম রূপ দেখা যায়। পুরুলিয়ার মুখোশ শুধুমাত্র নাচের অঙ্গ নয়, স্বতন্ত্র শিল্প বলে সারা দেশে বিখ্যাত। পুরুলিয়ার চড়িদা গ্রাম  মুখোশ শিল্পের জন্য খ্যাত। জানা যায়, বাঘমুন্ডির সামন্ত রাজা কোনো এক সময়ে এই শিল্পীদের চড়িদা গ্রামে নিয়ে এসে বসতি স্থাপন করান।  বেশকিছু পরিবার এই মুখোশ নির্মাণ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। বংশপরম্পরায় এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত এবং প্রধান জীবিকা। চড়িদা গ্রামের রাস্তার দুধারে ঘরে ঘরে মুখোশের পসরা সাজিয়ে বসে। একেকটা একেক ধরনের। চোখ জুড়িয়ে যায়।  এখানকার ছৌ নাচের মুখোশগুলি যেমন সুন্দর ও অভিনব তেমনি এর তৈরীর কৌশল এক অনন্য শিল্প উৎকর্ষের পরিচায়ক। কয়েকটি স্তর বা পর্যায়ে মুখোশ তৈরী করা হয়। পুরুলিয়ার বিখ্যাত ছৌমুখোশগুলি হল শিব, দুর্গা, কার্তিক, গনেশ, লক্ষ্মী,সরস্বতী, মহিষাসুর, কিরাত কিরাতিনী, রাবণ। এছাড়া পশুচরিত্রের মধ্যে বাঘ, সিংহ, বরাহ, ভালুক, হনুমান ইত্যাদি মুখোশগুলি জনপ্রিয়। মুখোশ শিল্প এতো জনপ্রিয় হওয়া সত্বেও শিল্পীদের আর্থিক অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। 

ব্যাপ্তি ও দৃরতার দ্বারা ছৌ নৃত্য তার প্রতিবেশী নৃত্যগুলিকে প্রভাবিত করেছে। নাটুয়া, নাচনী, করম, ঝুমুর, জাওয়া, পাতা, পাইক, কাঠি ইত্যাদি নৃত্যগুলির সঙ্গে ছৌ নৃত্যের মিল রয়েছে। যেমন –পুরুলিয়ার নাটুয়া হল ছৌ নাচের ঘনিষ্ঠ। নাটুয়ার নৃত্যশিল্পীকে প্রচণ্ড শক্তিশালী, দুঃসাহসী, বলিষ্ঠ হতে হয়। পুরুলিয়ার নাটুয়া ও ছৌ নাচের মূলসূত্র এক বলে মনে হয়।

এতো জাঁকজমক, ঔজ্জ্বল্য, দেশ বিদেশে অনুষ্ঠান, পুরষ্কার ইত্যাদি সত্ত্বেও শিল্পীদের দারিদ্র্য মোচন হয়নি। এমন সুন্দর ঐতিহ্যবাহী শিল্পকলাকে সযত্নে লালন পালন করে চলেছে তবুও ছৌ শিল্পীরা উপযুক্ত সম্মান পাননি। সামগ্রিকভাবে এই শিল্পকলার ভবিষ্যত উজ্জ্বল বলা যায় না।

গ্রন্থসূত্র :

১) ছৌ , ইন্দ্রানী দত্ত শতপথী 

 ২) বাংলার লৌকিক নৃত্য, মহুয়া মুখোপাধ্যায় 
 ৩) ভারতের নৃত্যকলা, গায়ত্রী চট্টোপাধ্যায়।
৪) আশুতোষ ভট্টাচর্য্য, বাংলার লোকনৃত্য ১ম       খন্ড।
   ৫) ভারতীয় নৃত্যধারার সমীক্ষা, শঙ্কর লাল মুখোপাধ্যায়। 

                            বৈশাখী কুন্ডু 
               গৌড়ীয় নৃত্য সাধিকা।

Related posts

Leave a Comment