February 10, 2026
দেশ

ইউজিসি বিধি জটিল করল ২০২৭-এর আগে বিজেপির হিন্দু সংহতির কৌশল

উত্তরপ্রদেশে ২০২৭ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে হিন্দু ভোট একত্রিত করার লক্ষ্যে দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক কৌশল তৈরি করছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। জাতিগত বিভাজন অতিক্রম করে বৃহত্তর ধর্মীয় সংহতি গড়ে তোলাই ছিল এই কৌশলের মূল লক্ষ্য। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)-এর নতুন বিধি ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক সেই প্রচেষ্টাকে বড়সড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের জনপ্রিয় স্লোগান “বাঁটলে কাটবে, জুড়লে জিতবে” এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বারবার হিন্দু ঐক্য ও ধর্মীয় মূল্যবোধের উপর জোর দিয়ে বিজেপি চেয়েছিল জাতপাতের গণ্ডি ছাড়িয়ে এক বিস্তৃত হিন্দু ভোটব্যাঙ্ক গড়ে তুলতে। কিন্তু রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, কেন্দ্রের আনা ২০২৬ সালের নতুন ইউজিসি বিধি সেই কৌশলে ধাক্কা দিয়েছে।

নতুন বিধিতে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জাতিভিত্তিক বৈষম্য রোধে তফসিলি জাতি (এসসি), তফসিলি উপজাতি (এসটি) ও অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির (ওবিসি) জন্য বিশেষ সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে। সামাজিক ন্যায়ের লক্ষ্যে এই পদক্ষেপ নেওয়া হলেও, মিথ্যা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির স্পষ্ট বিধান না থাকায় সাধারণ শ্রেণির, বিশেষত উচ্চবর্ণের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

যদিও সুপ্রিম কোর্ট এই বিধির কার্যকারিতার উপর অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ দিয়েছে, তবু রাজনৈতিক মহলের ধারণা—ক্ষতি যা হওয়ার, তা ইতিমধ্যেই হয়ে গেছে। এই বিতর্ক ফের উসকে দিয়েছে দীর্ঘদিন চাপা থাকা জাতিগত আশঙ্কা এবং হিন্দু সমাজের অভ্যন্তরীণ বিভাজনকে সামনে এনে দিয়েছে, যা বিজেপি এতদিন মুছতে চাইছিল।
রাজ্যের এক প্রবীণ বিজেপি নেতার মতে, উত্তরপ্রদেশে দলের ঐতিহ্যগত শক্তি ব্রাহ্মণ, রাজপুত, বৈশ্য, কায়স্থ ও ভূমিহার সম্প্রদায়ের উপর নির্ভরশীল। ইউজিসি বিধি নিয়ে বিতর্কের পর এই গোষ্ঠীগুলির মধ্যেই অসন্তোষের সুর স্পষ্ট হচ্ছে। দলীয় নেতৃত্ব কীভাবে এই ক্ষোভ সামলাবে, তা নিয়ে অভ্যন্তরীণ আলোচনাও শুরু হয়েছে।

সংগঠনের স্তরেও অস্বস্তির ইঙ্গিত মিলছে। একাধিক জেলায় বিজেপির পদাধিকারী ও কর্মীদের পদত্যাগের খবর পাওয়া গেছে। কোথাও কোথাও প্রতিবাদের চিহ্ন হিসেবে দলীয় পতাকা নামিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। রাজনৈতিক মহল এই ঘটনাগুলিকে দলের ভেতরের অস্থিরতার প্রাথমিক লক্ষণ বলেই মনে করছে।

এই প্রভাব পড়েছে শিক্ষাঙ্গনেও। বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় ও এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানে ছাত্র ও শিক্ষকদের মধ্যে সংঘাতের খবর সামনে এসেছে। উচ্চবর্ণ ও নিম্নবর্ণের মধ্যে বিভাজনের অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করেছে।

সোশ্যাল মিডিয়াতেও এই বিতর্ক প্রবলভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। তীব্র ও মেরুকৃত প্রতিক্রিয়া আগুনে ঘি ঢেলেছে বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। নির্বাচনের সময় যত এগিয়ে আসছে, ততই এই ইস্যু বিজেপির কাছে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।
দলীয় সূত্রে জানা যাচ্ছে, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছেও উদ্বেগজনক প্রতিক্রিয়া পৌঁছেছে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং মূল ভোটব্যাঙ্কের মধ্যে ভারসাম্য ফেরাতে কেন্দ্রের তরফে কোনও সমাধানের আশায় রয়েছে বিজেপি।রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা, যদি ঐতিহ্যগত সমর্থকদের মধ্যে অসন্তোষ দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে উত্তরপ্রদেশে বিজেপির নির্বাচনী অঙ্কে তার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে। এখন দেখার, সামাজিক ন্যায় ও হিন্দু ঐক্যের বার্তার মধ্যে সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রেখে দল কতটা সফলভাবে নিজের কৌশল পুনর্গঠন করতে পারে।

Related posts

Leave a Comment