21 C
Kolkata
March 21, 2026
দেশ

নারীর সাম্যের জন্য ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে আলাদা করা জরুরি: তসলিমা নাসরিন

ভুবনেশ্বর, ২৪ সেপ্টেম্বর: বিশিষ্ট লেখিকা ও মানবাধিকারকর্মী ড. তসলিমা নাসরিন বলেছেন, নারীদের প্রকৃত সমতা প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে ধর্ম ও রাষ্ট্রকে আলাদা করা অত্যন্ত জরুরি।

শিক্ষা ‘ও’ অনুসন্ধান বক্তৃতায় (Siksha ‘O’ Anusandhan Lecture) বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, “বাংলাদেশ আমাকে দেশছাড়া করেছে। পশ্চিমবঙ্গ থেকেও আমাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। আজ আমার কোনো ঘর নেই, কোনো দেশ নেই। কিন্তু আমি মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করি এবং মনে করি নারীদের ধর্মীয় স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে।”

তসলিমা নাসরিন বলেন, “আইন সমতা ও মানবাধিকারের ভিত্তিতে হওয়া উচিত, ধর্মীয় শাস্ত্রের ওপর নয়, যেগুলি নারীর অধিকার সীমিত করে।”

গাইনোকলজিস্ট পেশায় এই বাংলাদেশি লেখিকা তাঁর বই ‘লজ্জা’ ও ‘দ্বিখণ্ডিতা’–র মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পরিচিতি পান। তিনি বলেন, কঠোর ধর্মীয় ব্যাখ্যা সবসময় নারীবিদ্বেষী এবং শাসন ব্যবস্থায় ধর্মের প্রভাব নারী অধিকারকে বাধাগ্রস্ত করে।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন এসওএ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক প্রদীপ্ত কুমার নন্দ, কার্যক্রম পরিচালনা করেন অধ্যাপক জ্যোতিরঞ্জন দাস এবং ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন অধ্যাপক রেণু শর্মা।

অতীতের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে নাসরিন বলেন, তিনি বাংলাদেশের ময়মনসিংহে এক ধর্মনিরপেক্ষ মুসলিম পরিবারে জন্মেছিলেন। তাঁর বাবা ছিলেন ডাক্তার, যিনি তাঁকে পড়াশোনায় উৎসাহ দিয়েছিলেন।

তিনি বলেন, “আমি সাহিত্য ও সংগীতে সমৃদ্ধ পরিবেশে বড় হয়েছি। কিন্তু ১২ বছর বয়সে বুঝতে পারি আমি নাস্তিক, কারণ দেখেছিলাম ধর্ম, সংস্কৃতি ও প্রথার মাধ্যমে নারীদের দমন করা হচ্ছে।”

লেখিকার বক্তব্য, “এটা প্রতিটি নারীরই গল্প। আমরা একই খাঁচায় বন্দি। একে আমরা শোষণ বলিনি, বরং বলেছি ‘প্রথা’। তাই নারী অধিকার রক্ষায় আমাদের একত্রিত হওয়া প্রয়োজন।”

তিনি আরও বলেন, “আমি যা দেখেছি, যা ভোগ করেছি, যা বিশ্বাস করেছি তা লিখেছি বিনা আপসে। প্রবন্ধ, উপন্যাস, কবিতা—সবকিছুর মাধ্যমে প্রতিবাদ করেছি। এগুলো শোষণের বিরুদ্ধে আমার অস্ত্র হয়ে উঠেছিল।”

ফলস্বরূপ, মানুষ রাস্তায় নেমে তাঁর মৃত্যুদণ্ড দাবি করে। তিনি বলেন, “রাষ্ট্র আমাকে রক্ষা করেনি। ৩১ বছর ধরে আমি নির্বাসনে আছি। আমি এক ‘দেশহীন নারী’। আজ আমার ঘর কোনো দেশ নয়, বরং প্রতিটি মানবতাবাদী, যুক্তিবাদী ও মুক্তচিন্তার মানুষের হৃদয়।”

তসলিমা নাসরিন মনে করিয়ে দেন, নারীবাদ কোনো পাশ্চাত্য ধারণা নয়; বরং তাঁর নিজের জীবনের অভিজ্ঞতাই তাঁকে প্রভাবিত করেছে। “যেখানে রাষ্ট্র ধর্মনিরপেক্ষ, সেখানেই নারীদের আশা থাকে।”

তিনি বলেন, “বিশ্বের সংঘাত আসলে দুই ভাবনার মধ্যে — ধর্মনিরপেক্ষতা বনাম মৌলবাদ, যুক্তিসঙ্গত চিন্তাভাবনা বনাম অন্ধ বিশ্বাস। আমি এখনও বিশ্বাস করি, আমরা যদি প্রশ্ন করার সাহস দেখাই, তবে পরিবর্তন সম্ভব।”

তাঁর বক্তৃতার শেষে তিনি নিজের লেখা কবিতা ‘দ্য ডেথলেস গার্ল’ আবৃত্তি করেন, আর শ্রোতারা দাঁড়িয়ে করতালির মাধ্যমে তাঁকে অভিনন্দন জানান।

Related posts

Leave a Comment