তিরুবনন্তপুরম, ২৮ জানুয়ারি: প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, আয়ুর্বেদ কোনও একটি সময়কাল বা অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যুগে যুগে এই প্রাচীন চিকিৎসা পদ্ধতি মানুষকে জীবনকে বোঝার, ভারসাম্য অর্জনের এবং প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেঁচে থাকার পথ দেখিয়ে এসেছে।কেরালার আর্য বৈদ্য শালা চ্যারিটেবল হাসপাতালের শতবর্ষ উদযাপন উপলক্ষে ভিডিও বার্তায় ভাষণ দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থার উপর আমরা সবসময় জোর দিয়েছি। সেই লক্ষ্যেই জাতীয় আয়ুষ মিশন চালু করা হয়েছে। পরিবর্তিত সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আয়ুর্বেদে আধুনিক প্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)-এর ব্যবহার বাড়াতে হবে।”এই গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে যুক্ত হতে পেরে তিনি আনন্দ প্রকাশ করেন এবং ১২৫ বছরের যাত্রায় আয়ুর্বেদ সংরক্ষণ, সুরক্ষা ও প্রসারে আর্য বৈদ্য শালার ভূমিকার প্রশংসা করেন।প্রধানমন্ত্রী প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা বৈদ্যরত্নম পি এস ভারিয়ারের অবদানের কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, জনকল্যাণের প্রতি তাঁর অঙ্গীকার ও আয়ুর্বেদের প্রতি আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি আজও দেশবাসীকে অনুপ্রাণিত করে।
আর্য বৈদ্য শালাকে ভারতের প্রাচীন চিকিৎসা ঐতিহ্যের এক জীবন্ত প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই প্রতিষ্ঠান শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানবতার সেবা করে চলেছে। বর্তমানে তারা ৬০০-র বেশি আয়ুর্বেদিক ওষুধ উৎপাদন করে এবং এমন হাসপাতাল পরিচালনা করে, যেখানে বিশ্বের ৬০টিরও বেশি দেশ থেকে রোগীরা চিকিৎসা নিতে আসেন। গত ১০০ বছর ধরে চ্যারিটেবল হাসপাতালের নিরবচ্ছিন্ন পরিষেবাই এই বিশ্বাসের ভিত্তি।তিনি বৈদ্য, চিকিৎসক, নার্সিং কর্মী এবং হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত সকলকে এই ঐতিহাসিক মাইলফলকের জন্য অভিনন্দন জানান।
পাশাপাশি আয়ুর্বেদিক ঐতিহ্যকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাঁচিয়ে রাখার জন্য কেরালাবাসীর প্রশংসা করেন।প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত ১০-১১ বছরে ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা পদ্ধতিকে আলাদা করে দেখার প্রবণতা থেকে সরে এসে একটি সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠেছে। আয়ুষ মন্ত্রকের প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আয়ুর্বেদ, যোগ, ইউনানি, সিদ্ধ ও হোমিওপ্যাথিকে এক ছাতার তলায় আনা হয়েছে।তিনি জানান, দেশে ১২ হাজারেরও বেশি আয়ুষ ওয়েলনেস সেন্টার চালু হয়েছে, যেখানে যোগ, প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা ও কমিউনিটি স্বাস্থ্য পরিষেবা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি অন্যান্য হাসপাতালের সঙ্গে আয়ুষ পরিষেবার সংযোগ স্থাপন করা হয়েছে, যাতে দেশের প্রতিটি প্রান্তে ওষুধ পৌঁছায়।এই নীতির ফলে আয়ুষ উৎপাদন ক্ষেত্র দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। আয়ুষ রপ্তানি উন্নয়ন পরিষদ গঠনের ফলে ২০১৪ সালে যেখানে আয়ুষ ও ভেষজ পণ্যের রপ্তানি ছিল প্রায় ৩,০০০ কোটি টাকা, তা বেড়ে বর্তমানে ৬,৫০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা কৃষকদেরও উপকৃত করছে।তিনি আরও বলেন, আয়ুষ-ভিত্তিক মেডিক্যাল ভ্যালু ট্রাভেলের কেন্দ্র হিসেবেও ভারত আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাচ্ছে।
এর জন্য আয়ুষ ভিসার মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।প্রধানমন্ত্রী জানান, ব্রিকস ও জি-২০ সম্মেলনের মতো আন্তর্জাতিক মঞ্চে আয়ুর্বেদকে তুলে ধরা হয়েছে। গুজরাটের জামনগরে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গ্লোবাল ট্র্যাডিশনাল মেডিসিন সেন্টার স্থাপনের কাজ চলছে, পাশাপাশি আয়ুর্বেদে শিক্ষাদান ও গবেষণার জন্য বিশেষ প্রতিষ্ঠানও গড়ে উঠছে।বর্ধমান চাহিদা মেটাতে গঙ্গা নদীর তীরবর্তী এলাকায় ঔষধি গাছ চাষে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সাম্প্রতিক বাণিজ্য চুক্তিকে ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসার জন্য বড় সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। এই চুক্তির ফলে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ভারতীয় যোগ্যতাসম্পন্ন আয়ুষ চিকিৎসকেরা পরিষেবা দিতে পারবেন এবং সেখানে আয়ুষ ওয়েলনেস সেন্টার গড়ে তোলা সহজ হবে।তিনি বলেন, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আয়ুর্বেদ মানুষের চিকিৎসা করলেও, প্রমাণভিত্তিক গবেষণার অভাবে অনেক সময় এর গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে হয়েছে।
এই ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক গবেষণা, সিএসআইআর ও আইআইটির সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ, ক্যানসার চিকিৎসা ও ক্লিনিক্যাল স্টাডির মাধ্যমে আয়ুর্বেদকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য আর্য বৈদ্য শালার ভূমিকার প্রশংসা করেন তিনি।পরিশেষে প্রধানমন্ত্রী আধুনিক সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আয়ুর্বেদে প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সংযোজনের উপর জোর দেন এবং ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সেতুবন্ধন গড়ে তোলার জন্য প্রতিষ্ঠানটির প্রশংসা করেন।অনুষ্ঠানে কেরালার রাজ্যপাল রাজেন্দ্র ভি আর্লেকর-সহ অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
