ইসলামাবাদ, ২৪ জানুয়ারি: পাকিস্তানে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে ফের গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করল আন্তর্জাতিক তদন্তকারী সংস্থাগুলি। ‘সত্য অস্বীকার: কীভাবে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ এক অমীমাংসিত মামলা তৈরি করল’ শীর্ষক এক নতুন তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। ২০১৪ সালে পাকিস্তানের সিন্ধ প্রদেশে খুন হওয়া সাংবাদিক শান দাহারের হত্যা মামলার তদন্তে চরম গাফিলতি, পুলিশের অসদাচরণ, রাজনৈতিক অনিচ্ছা এবং দীর্ঘদিনের দণ্ডমুক্তির সংস্কৃতির ছবি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে এই প্রতিবেদনে।
২০১৪ সালের ১ জানুয়ারি রাতে সিন্ধ প্রদেশের বাদেহ শহরে ওষুধ পাচার সংক্রান্ত একটি ভিডিও প্রতিবেদন তৈরি করার সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে খুন হন সাংবাদিক শান দাহার। ঘটনার বারো বছরেরও বেশি সময় কেটে গেলেও এখনও পর্যন্ত তাঁর খুনিদের কাউকে গ্রেপ্তার করা যায়নি। এই ঘটনাই পাকিস্তানে সাংবাদিক হত্যা সংক্রান্ত দণ্ডমুক্তির ভয়াবহ বাস্তবতাকে নগ্ন করে তুলেছে বলে দাবি তদন্তকারীদের।
এই নতুন তদন্তটি করেছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম স্বাধীনতা রক্ষা সংস্থা ‘ফ্রি প্রেস আনলিমিটেড’, ‘রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স’ এবং ‘কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস’। ‘সত্যের জন্য নিরাপদ বিশ্ব’ প্রকল্পের আওতায় যৌথভাবে এই অনুসন্ধান চালানো হয়। তদন্তে শান দাহারের হত্যাকাণ্ড সংক্রান্ত একাধিক নতুন তথ্য উঠে এসেছে।
তদন্তকারী সংস্থাগুলির স্পষ্ট বক্তব্য, এই হত্যাকাণ্ড এখনও অমীমাংসিত থাকার মূল কারণ হলো ত্রুটিপূর্ণ তদন্ত প্রক্রিয়া এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘এই মামলায় সঠিক তদন্ত না হওয়া এবং রাজনৈতিক স্তরে দৃঢ় সিদ্ধান্তের অভাবই ন্যায়বিচারের পথ রুদ্ধ করেছে।’
উল্লেখযোগ্যভাবে, ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে সাংবাদিক হত্যার দায়মুক্তির অবসান দিবসে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ঘোষণা করেছিলেন, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অপরাধের কার্যকর তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে তাঁর সরকার পদক্ষেপ নেবে। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রতিশ্রুতির কোনও প্রতিফলন এখনও দেখা যায়নি বলেই অভিযোগ তুলেছে তদন্তকারী সংস্থাগুলি।
তথ্য অনুযায়ী, গত দশ বছরে শুধু পাকিস্তানেই অন্তত পঁয়ত্রিশ জন সাংবাদিক খুন হয়েছেন। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রকৃত অর্থে কোনও স্বাধীন ও কার্যকর তদন্ত হয়নি। অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডই অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
শান দাহারের হত্যা মামলার তদন্তে আরও উঠে এসেছে, কর্তৃপক্ষ যে ঘটনার বর্ণনা দিয়েছে তা বাস্তবসম্মত নয়। মামলার সঙ্গে যুক্ত দুই সাক্ষী জানিয়েছেন, তাঁদের জোর করে মিথ্যা তথ্য দিতে বাধ্য করা হয়েছিল। অর্থাৎ গোটা তদন্ত প্রক্রিয়াটিই ছিল প্রশ্নবিদ্ধ ও সাজানো।
আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলি পাকিস্তান সরকারের কাছে জোরালো দাবি জানিয়েছে—নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলির সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে এই মামলার নতুন করে স্বাধীন তদন্ত শুরু করতে হবে। তাদের মতে, সম্পদের অভাব ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে হলে গণমাধ্যম স্বাধীনতা রক্ষাকারী সংগঠনগুলির সঙ্গে সমন্বয় অপরিহার্য।
দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক ‘রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স’-এর প্রধান সেলিয়া মার্সিয়ে বলেন, ‘প্রায় বারো বছর হয়ে গেল, শান দাহারের খুনিরা এখনও অধরা। এটি পাকিস্তানে সাংবাদিক হত্যার দায়মুক্তির ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। এই যৌথ তদন্ত পাকিস্তানের বিচারব্যবস্থার গভীর ব্যর্থতাকে সামনে এনেছে। আমরা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি জানাচ্ছি—স্বাধীন তদন্ত পুনরায় শুরু করুন, দোষীদের গ্রেপ্তার করে বিচার করুন, সাংবাদিক সুরক্ষা আইন কার্যকর করুন এবং নাগরিক সমাজের সঙ্গে সহযোগিতা করুন, যাতে শান দাহারের পরিবার ন্যায়বিচার পায়।’
‘কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস’-এর এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রধান বেহ লিহ ই বলেন, ‘পাকিস্তানে সাংবাদিক হত্যা এখন সবচেয়ে নিরাপদ অপরাধগুলির একটি হয়ে দাঁড়িয়েছে। শান দাহারের হত্যা দণ্ডমুক্তির সংস্কৃতির প্রতীক। বারো বছরেও তাঁর পরিবারের জন্য কোনও ন্যায়বিচার নেই। পাকিস্তান এখনও সাংবাদিকদের জন্য পৃথিবীর অন্যতম বিপজ্জনক দেশ। নতুন প্রমাণ সামনে আসার পর এখন সরকারের দায়িত্ব দোষীদের গ্রেপ্তার করা এবং বিচারের মুখোমুখি করা। এখন প্রশ্ন একটাই—প্রধানমন্ত্রী সত্যিই সাংবাদিকদের রক্ষা করতে চান, না কি তাঁর কথাগুলো শুধুই ফাঁকা প্রতিশ্রুতি।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রতিবেদন শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত নয়, বরং পাকিস্তানে সাংবাদিকতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়েই গভীর প্রশ্ন তুলে দিল। দণ্ডমুক্তির এই সংস্কৃতি চলতে থাকলে সেখানে স্বাধীন সাংবাদিকতা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে বলেই আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকেরা।
