24 C
Kolkata
February 28, 2026
দেশ বিদেশ

ডুরান্ড রেখায় সংঘর্ষ তীব্র, পুরনো মিত্র এখন প্রকাশ্য প্রতিপক্ষ— নতুন ‘গ্রেট গেম’-এ চাপে পাকিস্তান

দিল্লি — ডুরান্ড রেখা ঘিরে কয়েক মাসের টানাপোড়েনের পর পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা কার্যত প্রকাশ্য সংঘাতে রূপ নিয়েছে। সীমান্ত বন্ধ, বিচ্ছিন্ন গোলাগুলি এবং আকাশপথে হামলার পাল্টা হামলায় দুই দেশের সম্পর্ক নতুন করে অস্থির হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, একসময় গোপন সহযোগী থাকা পক্ষগুলির এই সংঘাত দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন ‘গ্রেট গেম’-এর ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ব্রিটিশ আমলে আঁকা প্রায় ২,৬০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ডুরান্ড রেখা দু’দেশকে আলাদা করলেও কাবুল কখনও আনুষ্ঠানিকভাবে এই সীমারেখা মেনে নেয়নি। আফগান শাসকগোষ্ঠীগুলি বরাবরই পাকিস্তানের অভ্যন্তরে পশতু অধ্যুষিত অঞ্চল নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। ফলে এই সীমান্ত দীর্ঘদিন ধরেই উত্তেজনার কেন্দ্র।

গত অক্টোবর থেকে সংঘর্ষের সূত্রপাত। ইসলামাবাদ একাধিকবার আফগান ভূখণ্ডে আকাশপথে হামলা চালিয়েছে। পাকিস্তানের অভিযোগ, আফগানিস্তানের তালিবান শাসন তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান এবং ইসলামিক স্টেটের সঙ্গে যুক্ত জঙ্গিদের আশ্রয় দিচ্ছে। কাবুল এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। একাধিক কূটনৈতিক বৈঠক হলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি।

সম্প্রতি পাকিস্তানে একাধিক ভয়াবহ হামলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকে ইসলামাবাদের এক মসজিদে আত্মঘাতী বিস্ফোরণে ৩০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। পাকিস্তানের দাবি, হামলার নেপথ্যে থাকা জঙ্গি নেতৃত্ব আফগান ভূখণ্ডে অবস্থান করছে।

উল্লেখযোগ্য বিষয়, আফগান তালিবান ও পাকিস্তানি তালিবান— উভয় সংগঠনই পশতু সম্প্রদায়ভিত্তিক। একসময় মার্কিন নেতৃত্বাধীন অভিযানের বিরুদ্ধে তারা একইসঙ্গে লড়াই করেছে। অভিযোগ রয়েছে, সেই সময়ে পাকিস্তানের ভেতর থেকেই নানা ধরনের সহায়তা পেয়েছিল জঙ্গিরা। আশির দশকে সোভিয়েত বিরোধী লড়াইয়ে ইসলামাবাদের কৌশলগত সমর্থন থেকেই যে সম্পর্কের সূচনা, তা সময়ের সঙ্গে জটিল ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রূপ নিয়েছে।

শুক্রবার আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রক দাবি করেছে, তাদের বায়ুসেনা পাকিস্তানের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। কাবুলের সংবাদমাধ্যমেও সেই বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছে। যদিও এই দাবি নিয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তালিবান শাসন ২০২১ সালে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহারের পর সীমিত সংখ্যক যুদ্ধবিমান ও হেলিকপ্টার উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে বলে জানা যায়, তবে সেগুলির কার্যক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

অন্যদিকে পাকিস্তানের কাছে প্রায় ৪০০ যুদ্ধবিমান এবং প্রায় ছয় লক্ষ সক্রিয় সেনাসদস্য রয়েছে। তালিবান বাহিনীর আনুমানিক শক্তি প্রায় ১ লক্ষ ৭০ হাজার। উপরন্তু পাকিস্তান পারমাণবিক অস্ত্রসজ্জিত রাষ্ট্র হওয়ায় এই সংঘাতের কৌশলগত গুরুত্ব আরও বেড়েছে।

২০২১ সালের আগস্টে কাবুলে তালিবান ক্ষমতায় ফেরার পর পাকিস্তান প্রকাশ্যে তা স্বাগত জানিয়েছিল। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান মন্তব্য করেছিলেন, আফগানরা ‘দাসত্বের শৃঙ্খল ভেঙেছে’। সে সময় পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থার তৎকালীন প্রধান ফৈজ হামিদের কাবুল সফরের ছবি আন্তর্জাতিক মহলে আলোড়ন তোলে। পরে ২০২৪ সালে ফৈজ হামিদ গ্রেপ্তার হন এবং আদালত তাঁকে দীর্ঘ কারাদণ্ড দেয়। বিশ্লেষকদের মতে, আফগান নীতি ঘিরে অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াইও তাঁর পতনের অন্যতম কারণ।

বর্তমানে সীমান্তপারের হামলা ও পাল্টা অভিযোগে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত। ডুরান্ড রেখার পাহাড়ি অঞ্চল, যা একসময় কৌশলগত গভীরতা ও আশ্রয়স্থলের প্রতীক ছিল, এখন নতুন ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্রবিন্দুতে। পর্যবেক্ষকদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ার এই অস্থিরতা ভবিষ্যতে বৃহত্তর আঞ্চলিক সমীকরণে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

Related posts

Leave a Comment