মুম্বই, ৭ ফেব্রুয়ারি: আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত শনিবার ‘স্বদেশি’ অর্থনৈতিক মডেলের পক্ষে জোরালো সওয়াল করে বলেন, বিশ্বব্যাপী পারস্পরিক নির্ভরশীলতা বাস্তব হলেও তা যেন কোনওভাবেই চাপ, বাণিজ্য যুদ্ধ বা শুল্ক-নির্ভর বাধ্যবাধকতার ফল না হয়। বরং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য হওয়া উচিত প্রতিটি দেশের নিজস্ব ইচ্ছা ও সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে। আরএসএসের শতবর্ষ উপলক্ষে আয়োজিত দুই দিনের ‘নিউ হরাইজনস’ বক্তৃতা সিরিজে ভাষণ দিতে গিয়ে তিনি এই মন্তব্য করেন। অনুষ্ঠানে অভিনেতা সলমন খান, রণবীর কাপুর-সহ বিজ্ঞানী, শিল্পপতি ও শিল্পকলার সঙ্গে যুক্ত ৯০০-র বেশি বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব উপস্থিত ছিলেন।
মোহন ভাগবত বলেন, বিশ্ব স্বাভাবিকভাবেই পরস্পর নির্ভরশীল হলেও তা যেন ‘অসহায়তা’ বা ‘বাধ্যবাধকতা’-তে পরিণত না হয়। সাম্প্রতিক সময়ে বিশেষ করে আমেরিকার তরফে বাড়তে থাকা শুল্ক আরোপের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, এই ধরনের নীতি অনেক সময় চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তিনি স্পষ্ট করেন, স্বদেশি মানে আত্মবিচ্ছিন্নতা বা আমদানি সম্পূর্ণ বন্ধ করা নয়। বরং এর মূল নীতি হল—স্থানীয় উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দেওয়া, প্রয়োজন অনুযায়ী সীমিত আমদানি করা এবং মানুষের জীবিকা রক্ষা করা। তাঁর কথায়, “যে পণ্য নিজের গ্রাম বা দেশেই তৈরি করা সম্ভব, তা বিদেশ থেকে কেনা উচিত নয়। শুধুমাত্র একান্ত প্রয়োজনীয় এবং দেশে উৎপাদন অসম্ভব এমন পণ্যই আমদানি করা উচিত। দেশে সহজলভ্য পণ্য আমদানি করলে তা স্থানীয় বিক্রেতা ও অর্থনীতিকে আঘাত করে।”
আরএসএস প্রধান এমন এক উন্নয়ন মডেলের কথা বলেন, যা আত্মনির্ভরতা, পরিবেশগত স্থায়িত্ব এবং ধর্মভিত্তিক অর্থনীতির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখবে। তিনি পরিবারগুলিকে দৈনন্দিন জীবনে ‘স্বদেশি’ অভ্যাস গড়ে তোলার আহ্বান জানান—ভাষা, ভূষণ, ভ্রমণ, ভোজন ও ভবন এই পাঁচ ক্ষেত্রকে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, ঘরে মাতৃভাষা বা ভারতীয় ভাষার ব্যবহার বাড়ানো উচিত এবং দৈনন্দিন কথাবার্তায় বিদেশি ভাষার উপর নির্ভরতা কমানো প্রয়োজন। দেশীয় পোশাক ও ঐতিহ্যবাহী বস্ত্র ব্যবহারে স্থানীয় তাঁতশিল্প ও বস্ত্র শিল্প উপকৃত হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। মোহন ভাগবত বলেন, বিদেশ ভ্রমণের আগে দেশের তীর্থস্থান ও ঐতিহ্যবাহী স্থান ঘোরা উচিত, যাতে দেশের সম্পদ দেশের মধ্যেই থাকে।
তিনি ‘শিকঞ্জি বনাম কোলা’-র উদাহরণ দিয়ে বলেন, যদি ঘরে লেবুর শরবত তৈরি করা যায়, তবে বিদেশি কোমল পানীয় কেনার প্রয়োজন নেই। তিনি আরও বলেন, নিজের গ্রাম, শহর বা রাজ্যে উৎপাদিত পণ্য ব্যবহারে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। পরিবেশগত স্বদেশির অংশ হিসেবে প্লাস্টিকের ব্যবহার কমিয়ে ঐতিহ্যবাহী, টেকসই ভারতীয় গৃহস্থালি পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি। পরিবারের মধ্যে নিয়মিত আলোচনা প্রয়োজন বলেও তিনি মত প্রকাশ করেন, যাতে শিশুরা ভারতীয় মূল্যবোধের সঙ্গে সঙ্গতিহীন বিদেশি চিন্তাধারায় প্রভাবিত না হয়।
ভারতীয় পরিবার ব্যবস্থায় নারীর ‘মাতৃশক্তি’ রূপে ভূমিকার প্রশংসা করে তিনি বলেন, সমাজের ভিত্তি গড়ে ওঠে এই মূল্যবোধ থেকেই। তাঁর বার্তা ছিল—“ভারতের জন্য উদ্ভাবন করুন, ভারতে উৎপাদন করুন এবং বিশ্বকে আপনার কাছে আসতে দিন। নিজেদের শক্তির উপর দাঁড়িয়ে সমৃদ্ধি গড়লে, বিশ্ব দরজা বন্ধ করলেও ভারত এগিয়ে যাবে।”
