জলসংকট যখন জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে, তখন ছত্তিশগড়ের কোরিয়া জেলা দেখাল কীভাবে বড় বাঁধ বা ভারী যন্ত্রপাতি ছাড়াই শুধু মানুষের অংশগ্রহণে কার্যকর সমাধান সম্ভব। কেন্দ্রের জল শক্তি মন্ত্রক জানিয়েছে, ‘জল সঞ্চয় জন ভাগিদারি’-র ভাবনা থেকে এই উদ্যোগ শুরু হয়।
এই উদ্যোগের মূল ধারণা ছিল সহজ—যদি প্রতিটি কৃষক স্বেচ্ছায় নিজের জমির মাত্র ৫ শতাংশ অংশ জল সংরক্ষণের জন্য বরাদ্দ করেন, তাহলে কী হতে পারে? এই ভাবনা থেকেই শুরু হয় ‘আওয়া পানি ঝোকি’ আন্দোলন।
এই কর্মসূচির আওতায় কৃষকরা নিজেদের জমির একটি ছোট অংশে রিচার্জ পুকুর এবং ধাপযুক্ত গর্ত তৈরি করেন। এসব কাঠামোর মাধ্যমে বর্ষার জল সরাসরি জমিতেই ধরে রাখা হয়, যাতে সেই জল মাটিতে শোষিত হয়ে পরে ব্যবহার করা যায়।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ১,২৬০ জনেরও বেশি কৃষক নিজেদের জমিতে স্বেচ্ছায় এই ৫ শতাংশ রিচার্জ পদ্ধতি গ্রহণ করেছেন। পাশাপাশি জেলাজুড়ে ২,০০০টিরও বেশি সোক পিট তৈরি হয়েছে। গ্রামীণ আবাসন প্রকল্পের উপভোক্তারাও নিজেদের বাড়ির পাশে সোক পিট তৈরি করে জল সংরক্ষণের উদ্যোগে অংশ নিয়েছেন।
এই উদ্যোগের ফলে পরিবেশ ও সমাজ—দুই ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গেছে। বহু গ্রামে ভূগর্ভস্থ জলের স্তর ৩ থেকে ৪ মিটার পর্যন্ত বেড়েছে। পাশাপাশি ১৭টি দুর্গম আদিবাসী গ্রামে শুকিয়ে যাওয়া ঝরনাগুলিও আবার সচল হয়েছে।
মাটির আর্দ্রতা বাড়ায় কৃষি উৎপাদনও উন্নত হয়েছে। জীবিকা স্থিতিশীল হওয়ায় মৌসুমি কাজের জন্য অন্যত্র যাওয়ার প্রবণতা প্রায় ২৫ শতাংশ কমেছে। আগে যে বৃষ্টির জল নষ্ট হয়ে যেত, এখন তা মাটিতে শোষিত হয়ে ভূগর্ভস্থ জলের ভাণ্ডার ভরিয়ে তুলছে।
এই আন্দোলনের অন্যতম শক্তি ছিল সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ। মহিলারা ‘নীর নায়িকা’ হিসেবে সামনে এসে পরিবারগুলিকে সোক পিট তৈরিতে উৎসাহিত করেছেন এবং লোকগানের মাধ্যমে জল সংরক্ষণ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়িয়েছেন। অন্যদিকে যুব স্বেচ্ছাসেবীরা ‘জল দূত’ হিসেবে খাল পরিষ্কার, ট্রেঞ্চ চিহ্নিতকরণ ও পথনাটক-দেয়ালচিত্রের মাধ্যমে প্রচারে অংশ নিয়েছেন।
সমবেত শ্রমদানের মাধ্যমে ৪৪০টিরও বেশি ঐতিহ্যবাহী পুকুর পুনরুজ্জীবিত করা হয়েছে, যা এখন প্রাকৃতিক জলাধার হিসেবে কাজ করছে। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর আবাস যোজনার ৫০০-রও বেশি উপভোক্তা নিজেদের বাড়ির পাশে সোক পিট তৈরি করেছেন।
কেন্দ্রের জল শক্তি মন্ত্রকের মতে, কোরিয়ার ‘৫% মডেল’ প্রমাণ করে যে জলবায়ু অভিযোজন বিকেন্দ্রীভূত, সাশ্রয়ী এবং অংশগ্রহণমূলক হতে পারে। জমির সামান্য অংশ জল সংরক্ষণের জন্য ব্যবহার করেই স্থানীয় মানুষ নিজেদের জল ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করেছেন।

