তেহরান, ১ মার্চ: ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলী খামেনেইয়ের যৌথ মার্কিন-ইজরায়েলি সামরিক অভিযানে নিহত হওয়ার পর ইসলামি প্রজাতন্ত্র এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। প্রায় চার দশক নেতৃত্ব দেওয়ার পর তাঁর অনুপস্থিতিতে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন— কে হবেন পরবর্তী সুপ্রিম লিডার?
ইরানের সংবিধান অনুযায়ী, সর্বোচ্চ নেতার নির্বাচন ও তদারকির দায়িত্বে রয়েছে Assembly of Experts। তবে বাস্তবে এই সিদ্ধান্ত কেবল ধর্মীয় মর্যাদা নয়, রাজনৈতিক প্রভাব এবং শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সমর্থনের উপর নির্ভর করে। বিশেষ করে Islamic Revolutionary Guard Corps (আইআরজিসি)-র ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়।
সম্ভাব্য উত্তরসূরি: মুজতবা খামেনেই
খামেনেইয়ের দ্বিতীয় পুত্র মোজতবা খামেনেইকে অনেকেই সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে দেখছেন। ১৯৬৯ সালে মাশহাদে জন্ম তাঁর। পিতার শাসনকালে তিনি সুপ্রিম লিডারের দপ্তরে প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করেছেন বলে জানা যায়। আইআরজিসি এবং তাদের স্বেচ্ছাসেবী আধাসামরিক শাখা বাসিজের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। যদিও তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে উচ্চপদে ছিলেন না, তবু পর্দার আড়ালে তাঁর প্রভাব ছিল উল্লেখযোগ্য।
আয়াতোল্লাহ আরাফি: প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিতে শক্তিশালী
আরেক সম্ভাব্য নাম আয়াতোল্লাহ আলীরেজা আরাফি। তিনি বর্তমানে অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস-এর উপ-সভাপতি এবং ইরানের সেমিনারি ব্যবস্থার প্রধান। অতীতে তিনি গার্ডিয়ান কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন, যে সংস্থা নির্বাচনী প্রার্থী ও সংসদে পাস হওয়া আইন যাচাই করে।
কঠোর অবস্থানের জন্য রক্ষণশীল মহলে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কড়া ভাষায় মন্তব্য করে তিনি আলোচনায় আসেন। একবার তিনি সতর্ক করে বলেছিলেন, “যারা আলেমদের পাগড়ি আক্রমণ করবে, তাদের পাগড়িই হবে তাদের কাফন।”
আয়াতোল্লাহ মিরবাঘেরি: কঠোর মতাদর্শের প্রবক্তা
আয়াতোল্লাহ মিরবাঘেরি ২০১৬ সাল থেকে অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস-এর সদস্য। তিনি কোমে অবস্থিত অ্যাকাডেমি অব ইসলামিক সায়েন্সেস-এর প্রধান, যেখানে ‘ইসলামি বিজ্ঞান’-এর বিকাশ ও প্রচার করা হয়।
মিরবাঘেরি সংবিধানে নির্ধারিত তদারকি ভূমিকার পরিবর্তে অ্যাসেম্বলির কাজকে সুপ্রিম লিডারের সমর্থনে সীমাবদ্ধ রাখার পক্ষে মত দেন। তিনি ‘ভেলায়াত-এ ফকিহ’ বা ইসলামী ফকিহের অভিভাবকত্ব তত্ত্বের অধীনে খামেনেইয়ের সর্বময় কর্তৃত্বের জোরালো সমর্থক ছিলেন।
সিদ্ধান্তের পথে রাজনৈতিক সমীকরণ
ইরানের পরবর্তী সুপ্রিম লিডার নির্বাচন শুধু ধর্মীয় প্রক্রিয়া নয়, বরং ক্ষমতার সূক্ষ্ম ভারসাম্যের ফল। আইআরজিসি, রক্ষণশীল ধর্মীয় নেতৃত্ব এবং রাজনৈতিক এলিটদের সমর্থন ছাড়া এই পদে আসীন হওয়া কঠিন।
বিশ্লেষকদের মতে, খামেনেইয়ের মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার প্রশ্নটি ইরানের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক অবস্থানের উপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে। সিদ্ধান্ত যেদিকেই যাক, তা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতেও বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিতে পারে।
