কুয়েত/রিয়াধ — রাজনীতি বা কূটনীতির মঞ্চে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক যতই তিক্ত হোক না কেন, মানুষের সম্পর্ক যে অনেক সময় সেই বিভাজন মানে না— তারই এক বাস্তব উদাহরণ সামনে এল পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে। যুদ্ধের কারণে বিদেশে আটকে পড়া এক বাঙালি যুবকের পাশে দাঁড়ালেন পাকিস্তান, নেপাল এবং বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ।
বর্ধমান শহরের বাসিন্দা বছর ২৮-এর অর্ঘ্য বণিক, পেশায় একজন আইটি কর্মী। কর্মসূত্রে তিনি বেঙ্গালুরুতে থাকেন। একা ভ্রমণ করতে ভালোবাসেন অর্ঘ্য। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি এমনই এক সোলো ট্রিপে কুয়েতে গিয়েছিলেন তিনি। সেখান থেকে দুবাই, ওমান এবং কাতার ঘুরে ভারতে ফেরার পরিকল্পনা ছিল।
কিন্তু কুয়েতে পৌঁছানোর পরেই শুরু হয় ইরান-ইজরায়েল সংঘাত। আচমকাই বন্ধ হয়ে যায় আকাশপথ, বাতিল হয়ে যায় একের পর এক উড়ান। বিমানবন্দর এলাকায় গোলাগুলির ঘটনাও ঘটে। অচেনা দেশে সম্পূর্ণ একা আটকে পড়ে চরম আতঙ্কে পড়েন অর্ঘ্য।
এই কঠিন পরিস্থিতিতেই তাঁর পাশে দাঁড়ান দুই পাকিস্তানি নাগরিক। তাঁদের সাহায্যে শুধু আশ্রয়ই নয়, বিনা খরচে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাও হয় অর্ঘ্যের।
অর্ঘ্য জানিয়েছেন, প্রথমে কয়েক দিন দামি হোটেলে থাকার পরে তাঁর পকেটে টান পড়ে। বাধ্য হয়ে ফেসবুকের একটি ট্রাভেল কমিউনিটিতে সাহায্য চান তিনি। তখনই কয়েকজন প্রবাসী নেপালি শ্রমিক এগিয়ে আসেন। নিজেদের ছোট্ট ঘরে অর্ঘ্যের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করেন তাঁরা।
ঘরভাড়া বা খাবারের জন্য কোনও টাকা নিতেই চাননি সেই নেপালি যুবকেরা। নিজের পরিবারের সদস্যের মতোই আগলে রেখেছিলেন তাঁকে।
এরপর দেশে ফেরার জন্য এক সহযাত্রীর সঙ্গে সড়কপথে কুয়েত সীমান্ত পেরিয়ে কোনওক্রমে সৌদি আরবের রিয়াধে পৌঁছন অর্ঘ্য। সেখান থেকে ভারতের ফ্লাইট ধরার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু রিয়াধ বিমানবন্দরে পৌঁছানোর মাত্র ২০ মিনিট আগে ই-মেলে জানতে পারেন তাঁর ফ্লাইট বাতিল হয়েছে।
টানা কয়েক দিনের মানসিক চাপ ও অনিশ্চয়তায় ভেঙে পড়েন তিনি। সেই সময় তাঁর পাশে দাঁড়ান ক্যাবচালক পাকিস্তানি নাগরিক আরশাদ। শীতে কাঁপতে থাকা অর্ঘ্যকে নিজের জ্যাকেট খুলে দেন তিনি।
এরপর আরশাদ তাঁর বন্ধু আমের-এর সঙ্গে যোগাযোগ করেন, যিনি রিয়াধে থাকেন। আমের অর্ঘ্যকে নিজের কর্মস্থলে নিয়ে যান। সেখানে আরও কয়েকজন পাকিস্তানি ও বাংলাদেশি শ্রমিকের সঙ্গে তিন দিন নিরাপদে ছিলেন তিনি।
এই সময় বাংলাদেশিদের সঙ্গে গল্প-আড্ডায় জমে ওঠে দুই বাংলার কথা। মাঝরাতে তাঁকে পাকিস্তানি রেস্তোরাঁয় নিয়ে গিয়ে ঐতিহ্যবাহী খাবারও খাওয়ান আমের। অর্ঘ্য বিল দিতে চাইলে আমের সোজা জানিয়ে দেন, “আপ মেরে মেহমান হ্যায়, ইয়ে আপকা হি ঘর হ্যায়।”
এই অভিজ্ঞতায় আপ্লুত অর্ঘ্য। তাঁর কথায়, ছোটবেলা থেকে পাকিস্তান মানেই শুধু শত্রুতা ও যুদ্ধের গল্প শুনে বড় হয়েছেন। কিন্তু বাস্তবে তাঁদের কাছ থেকে যে নিঃস্বার্থ সাহায্য পেয়েছেন, তা তাঁর ধারণা বদলে দিয়েছে।
অর্ঘ্যের বাবা তাপস কংসবণিক ভারতীয় বায়ুসেনার অবসরপ্রাপ্ত কর্মী। ফৌজি পরিবারের সন্তান হয়েও তথাকথিত ‘শত্রু’ দেশের নাগরিকদের কাছ থেকে এমন ভালোবাসা পেয়ে আবেগাপ্লুত তিনি।
অর্ঘ্যের কথায়, “কাঁটাতার মানুষের মনকে ভাগ করতে পারে না— এই অভিজ্ঞতাই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।”
