22 C
Kolkata
February 20, 2026
দেশ

ভারতের কূটনীতিতে শীর্ষ তালিকায় ফ্রান্স, ‘বিশেষ কৌশলগত অংশীদারিত্ব’ ঘোষণা

দিল্লি: আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দ্রুত উঠে আসছে ফ্রান্স। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ-এর চলতি ভারত সফরের সময় দুই দেশ তাদের সম্পর্ককে ‘বিশেষ বিশ্ব কৌশলগত অংশীদারিত্ব’-এর পর্যায়ে উন্নীত করেছে, যা ভারতের বিদেশনীতি অগ্রাধিকারের তালিকায় ফ্রান্সের অবস্থান আরও শক্তিশালী হওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।

একটি বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই নতুন অংশীদারিত্ব শুধু বাণিজ্য বা প্রতিরক্ষা সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং প্রযুক্তি, নিরাপত্তা, শক্তি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার মতো দীর্ঘমেয়াদি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেও দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করবে।

সমাজমাধ্যমে এক বার্তায় প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ জানান, ‘ভারত এবং ফ্রান্স তাদের কৌশলগত সম্পর্ককে বিশেষ বিশ্ব কৌশলগত অংশীদারিত্বের স্তরে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কূটনীতির ভাষায় এর গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি।’ তাঁর এই মন্তব্য থেকেই স্পষ্ট, দুই দেশের সম্পর্ক এখন আরও গভীর এবং দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে।

দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সহযোগিতার নতুন দিগন্ত
১৯৯৮ সালে ভারত ও ফ্রান্সের মধ্যে কৌশলগত অংশীদারিত্ব শুরু হয়। নতুন ঘোষণার মাধ্যমে সেই সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত ও বৈশ্বিক মাত্রা দেওয়া হয়েছে। এর ফলে দুই দেশ এখন শুধু পারস্পরিক সহযোগিতার অংশীদার নয়, বরং বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থায় একে অপরের দীর্ঘমেয়াদি সহযোগী হিসেবে কাজ করবে।

এই অংশীদারিত্বের আওতায় প্রতি বছর বিদেশমন্ত্রীর স্তরে পর্যালোচনা বৈঠক হবে, যা ভারতের ‘হরাইজন ২০৪৭’ পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত থাকবে। এর ফলে সরকার পরিবর্তনের পরেও এই সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলে মনে করা হচ্ছে।

ভারতের জন্য এই উন্নয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ফ্রান্স এখন যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়ার মতো দেশের সঙ্গে একই স্তরের বিশেষ কৌশলগত অংশীদারের মর্যাদা পেল। এর ফলে ইউরোপীয় অঞ্চলের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে।

প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি ও খনিজ ক্ষেত্রে ২১টি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি
প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁর এই সফরের সময় প্রতিরক্ষা উৎপাদন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, শক্তি, স্বাস্থ্য, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ এবং উচ্চ প্রযুক্তি সহ মোট ২১টি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি ও সমঝোতা স্বাক্ষরিত হয়েছে।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদ্যোগগুলির মধ্যে রয়েছে ভারতের ভারত ইলেকট্রনিক্স লিমিটেড এবং ফ্রান্সের সাফরানের যৌথ উদ্যোগে ভারতে ‘হ্যামার’ ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন। এর ফলে ভারতের প্রতিরক্ষা উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং দেশীয় উৎপাদনকে আরও শক্তিশালী করা সম্ভব হবে।

এছাড়া দুই দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে পারস্পরিক অফিসার নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে সামরিক সহযোগিতা আরও গভীর হবে।

গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, শক্তি ও উদ্ভাবনে জোর
এই অংশীদারিত্বের মাধ্যমে লিথিয়াম, বিরল খনিজ এবং নবীকরণযোগ্য শক্তির ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানো হবে। এতে ভারতের জন্য সরবরাহ শৃঙ্খল বৈচিত্র্যময় হবে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে।

একই সঙ্গে ‘ভারত-ফ্রান্স উদ্ভাবন বর্ষ ২০২৬’-এর ঘোষণাও করা হয়েছে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মহাকাশ, কোয়ান্টাম প্রযুক্তি এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে দুই দেশের গবেষক, স্টার্টআপ এবং শিল্প সংস্থাগুলির মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো হবে।

বিশ্ব রাজনীতিতে ভারসাম্য রক্ষার কৌশল
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বড় শক্তিগুলির মধ্যে প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে ভারত ও ফ্রান্সের এই অংশীদারিত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি দুই দেশকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে আরও শক্তিশালী অবস্থান নিতে সাহায্য করবে।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী-ও এই অংশীদারিত্বকে ‘মানুষকেন্দ্রিক উদ্ভাবন এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের ভিত্তি’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিরক্ষা উৎপাদন, শক্তি এবং প্রযুক্তি ক্ষেত্রে যৌথ উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে ভারত ও ফ্রান্সের সম্পর্ক ভবিষ্যতে আরও দৃঢ় হবে এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এই অংশীদারিত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

Related posts

Leave a Comment