দিল্লি, ২৪ জানুয়ারি: ভারত–ইউরোপ সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হল শনিবার। ইউরোপীয় কমিশনের সভাপতি উরসুলা ভন ডার লায়েন রাষ্ট্রীয় সফরে ভারতে এসে পৌঁছালেন। এই সফরের অন্যতম প্রধান তাৎপর্য, তিনি ও ইউরোপীয় পরিষদের সভাপতি আন্তোনিও লুইস সান্তোস দা কস্তা একসঙ্গে ভারতের সাতাত্তরতম প্রজাতন্ত্র দিবস উদ্যাপনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। দুই পক্ষের কৌশলগত অংশীদারিত্বে এটি একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক বলে মনে করছে কূটনৈতিক মহল।
দিল্লিতে পৌঁছনোর পর উরসুলা ভন ডার লায়েনকে স্বাগত জানান বাণিজ্য ও শিল্প দপ্তর এবং ইলেকট্রনিক্স ও তথ্যপ্রযুক্তি দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী জিতিন প্রসাদ। এই সফরকে ঘিরে কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে জানানো হয়েছে, ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন—দুই বৃহত্তম গণতান্ত্রিক শক্তির সম্পর্ক পারস্পরিক বিশ্বাস, মূল্যবোধ ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সহযোগিতার উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে।
বিদেশ মন্ত্রকের তরফে জানানো হয়, এই রাষ্ট্রীয় সফরের মাধ্যমে ভারত–ইউরোপ কৌশলগত অংশীদারিত্বের পরবর্তী পর্বের রূপরেখা তৈরি হবে। পরিকাঠামো উন্নয়ন, বাণিজ্য, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা রক্ষার মতো ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও গভীর করার লক্ষ্যে এই সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।
এই সফরের আগেই দিল্লিতে পৌঁছেছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিদেশনীতি ও নিরাপত্তা নীতি বিষয়ক উচ্চপদস্থ প্রতিনিধি কাজা কাল্লাস। এটি তাঁর ভারতে প্রথম সরকারি সফর। বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে, নিয়মিত উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক যোগাযোগের ধারাবাহিকতায় এই সফর ভারত–ইউরোপ কৌশলগত অংশীদারিত্বকে আরও শক্তিশালী করবে।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গিয়েছে, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে অস্থিরতা, ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন ও আন্তর্জাতিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন পারস্পরিক সহযোগিতা আরও গভীর করতে আগ্রহী। সাম্প্রতিক সময়ে দুই পক্ষের মধ্যে ধারাবাহিক বৈঠক, আলোচনা ও উচ্চপর্যায়ের সফরের মাধ্যমে সেই কৌশলগত ঘনিষ্ঠতা স্পষ্ট হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে ভারতের বিদেশমন্ত্রী ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশগুলির রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে দিল্লিতে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেন। বৈঠকে বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক অস্থিরতা এবং পরিবর্তনশীল ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বিদেশমন্ত্রীর বক্তব্য ছিল, ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে পারে, সরবরাহ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে পারে এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে স্থিতাবস্থা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
বিদেশমন্ত্রী আরও বলেন, মানবিক সহায়তা, দুর্যোগ মোকাবিলা, জলদস্যু দমন, উন্নয়নমূলক প্রকল্প, বাণিজ্যিক সহযোগিতা এবং নিরাপত্তা অংশীদারিত্বের মাধ্যমে বিশ্বব্যবস্থাকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও স্থিতিশীল করা সম্ভব।
ইউরোপীয় পরিষদের সভাপতি আন্তোনিও লুইস সান্তোস দা কস্তা ও ইউরোপীয় কমিশনের সভাপতি উরসুলা ভন ডার লায়েনের এই সফর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আমন্ত্রণে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সফরকালে তাঁরা রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন এবং প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সীমিত পরিসরের বৈঠক ও প্রতিনিধিস্তরীয় আলোচনা করবেন।
আগামী সাতাশ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে চলেছে ষোড়শ ভারত–ইউরোপ শীর্ষ বৈঠক। এই বৈঠকে দুই নেতা যৌথভাবে সভাপতিত্ব করবেন। পাশাপাশি ভারত–ইউরোপ বাণিজ্য মঞ্চের একটি বিশেষ বৈঠক আয়োজনেরও পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং শিল্পক্ষেত্রে যৌথ উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা হবে।
কূটনৈতিক মহলের মতে, বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে ভারত–ইউরোপ অংশীদারিত্ব কেবল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা, শান্তি ও সহযোগিতার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। এই সফর সেই দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সম্পর্কের ভিত আরও শক্ত করবে বলেই মনে করা হচ্ছে।
